

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা পালনের সময় অসুস্থতা বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় বা চিকিৎসকের পরামর্শে স্যালাইন নিতে হয়। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—রোজা অবস্থায় স্যালাইন নেওয়া কি জায়েজ, নাকি এতে রোজা ভেঙে যায় এবং পরে কাজা করতে হয়। বিষয়টি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় ইসলামি ফিকহের আলোকে স্পষ্টভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মূল নীতি হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা খাদ্যসদৃশ কোনো বস্তু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা পানাহার করো, যতক্ষণ না ফজরের সাদা সুতো কালো সুতো থেকে পৃথক হয়ে যায়।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৭)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রোজার মৌলিক নিষেধাজ্ঞা হলো খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ। সুতরাং কোনো বস্তু যদি খাদ্য বা পানীয়ের বিকল্প হিসেবে শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে তা রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত হয়।
আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা হয়?
স্যালাইন মূলত শিরার মাধ্যমে শরীরে দেওয়া একটি তরল, যা শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্লুকোজ বা লবণজাত উপাদান সরবরাহ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে স্যালাইন শরীরকে শক্তি জোগায় এবং পানীয়ের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এ কারণেই অধিকাংশ ফিকহবিদ মনে করেন, রোজা অবস্থায় স্যালাইন নেওয়া রোজা ভেঙে দেয়। কারণ এটি সরাসরি খাদ্য ও পানীয়ের উদ্দেশ্য পূরণ করে, যদিও তা মুখ দিয়ে গ্রহণ করা হয় না।
হানাফি মাজহাবসহ অধিকাংশ আলেমের মত হলো, যে কোনো পদ্ধতিতে যদি শরীরে পুষ্টি বা শক্তি পৌঁছে যায়, তাহলে তা রোজা ভাঙার কারণ হবে। রাদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থে উল্লেখ আছে, খাদ্য ও পানীয়ের বিকল্প কোনো কিছু শরীরে প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে। স্যালাইন যেহেতু শরীরকে পানীয় ও শক্তি সরবরাহ করে, তাই এটি রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত।
তবে স্যালাইনের ধরন অনুযায়ী কিছু আলেম বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। যদি এমন কোনো ইনজেকশন বা তরল দেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসাজনিত এবং শরীরকে শক্তি বা পুষ্টি জোগায় না, তাহলে কিছু আলেমের মতে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহৃত অধিকাংশ স্যালাইনই শরীরের দুর্বলতা দূর করে এবং পানিশূন্যতা পূরণ করে, যা পানীয়ের উদ্দেশ্য পূরণ করে। তাই সমসাময়িক অধিকাংশ ফিকহ পরিষদ ও আলেমের সিদ্ধান্ত হলো—রোজা অবস্থায় স্যালাইন নিলে রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে।
আরও পড়ুন ঃ এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে কি রোজা কাজা করতে হবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর অবস্থা। যদি কেউ এমন অসুস্থ হন যে স্যালাইন না নিলে তার জীবন বা স্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে শরিয়ত তাকে রোজা ভাঙার অনুমতি দেয়। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর যে অসুস্থ বা সফরে আছে, সে পরে অন্য দিনে সেই সংখ্যা পূরণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, অসুস্থ অবস্থায় রোজা ভাঙা গুনাহ নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সহজীকরণের অংশ।
হাদিসেও চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি ও উৎসাহ পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা তিনি অবতীর্ণ করেননি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৮)। এই হাদিস প্রমাণ করে, প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত, এমনকি রোজা ভাঙলেও এতে কোনো গুনাহ নেই।
স্যালাইন নেওয়ার পর করণীয় বিষয় হলো, সুস্থ হওয়ার পর ঐ রোজার কাজা আদায় করা। এখানে কাফফারা ওয়াজিব হবে না, কারণ এটি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভাঙা নয়, বরং চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনের কারণে। শরিয়ত এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত মানবিক ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করেছে।
আরও পড়ুন ঃ রোজা রেখে অক্সিজেন বা নেবুলাইজার নেওয়া যাবে কি?
সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় স্যালাইন নেওয়া সাধারণভাবে রোজা ভেঙে দেয়, কারণ এটি পানীয় ও শক্তির বিকল্প হিসেবে কাজ করে। তবে এটি যদি চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজনে নেওয়া হয়, তাহলে তা জায়েজ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। শুধু পরে একটি রোজা কাজা আদায় করলেই দায়িত্ব পূর্ণ হয়ে যায়। সম্ভব হলে রোজার সময়ের বাইরে স্যালাইন নেওয়া উত্তম, কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে শরিয়ত রোজা ভাঙার অনুমতি দিয়েছে।
সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি মতামতের আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—রোজা অবস্থায় স্যালাইন নেওয়া জায়েজ হলেও এতে রোজা ভেঙে যায় এবং পরে কাজা আদায় করা আবশ্যক। এটি ইসলামের সহজীকরণ ও মানবিক বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মন্তব্য করুন

