শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পে স্কেলের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, বাস্তবায়ন কি চলতি মাসেই?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই কার্যকর হতে পারে এবং এটি জানুয়ারি মাস থেকেই কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে।

এ লক্ষ্যে সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি ১৫ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও ভাতা পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে। কমিশনের প্রতিবেদন আগামী ২১ জানুয়ারির মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে হয় সংশোধিত মূল বেতন কাঠামো অথবা নতুন ভাতাসমূহ কার্যকর করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশোধিত বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট হবে বলে মনে করছে সরকার।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নতুন বেতন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধি করা হবে।

এদিকে সরকার ইতোমধ্যে সংশোধিত বাজেট চূড়ান্ত করেছে এটি আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। নতুন বাজেটে মোট আকার ২ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশোধিত বাজেটে উন্নয়ন বাজেট ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হলেও অনুন্নয়ন বাজেট ২৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে, যার বড় অংশই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে। বর্তমানে দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ।

এছাড়া নতুন বেতন কাঠামো বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যদিও তাদের বেতন সরাসরি সরকারি বাজেট থেকে দেওয়া হয় না।

জাতীয় বেতন কমিশন বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য পৃথক বেতন কাঠামো সুপারিশ করতে পারে যদিও এটি সরকারি বেতন কাঠামো থেকে আলাদা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক করতে এবং বেতন নির্ধারণে অধিক নমনীয়তা আনতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এছাড়া বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও পৃথক বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সরকার গত বছরের জুলাই মাসে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছিল। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে, অর্থাৎ প্রায় এক দশক পর নতুন বেতন কাঠামো আসতে যাচ্ছে।

কমিশন গত ১০ বছরের মূল্যস্ফীতির সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ প্রস্তুত করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো নতুন কাঠামোয় প্রকৃত মজুরি যেন ২০১৫ সালের স্তরের নিচে নেমে না যায়। একই সঙ্গে সরকার কমিশনকে দেশের রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা এবং বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে।

এর আগে, ২০১৫ সালের বেতন স্কেল দুই ধাপে কার্যকর হয়েছিল- সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর হয় ১ জুলাই ২০১৫ থেকে এবং নতুন ভাতা কার্যকর হয় এক বছর পর। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা, এটি নতুন স্কেল কার্যকরের পর পরের অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৭৭৫ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির জন্য ৩৫ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে নবম পে কমিশনের সর্বশেষ বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, পে স্কেলে আগের ২০টি গ্রেডের কাঠামোই বহাল থাকছে এবং তা পরিবর্তন না করেই কমিশন বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। কমিশনের একজন সদস্য বলেন, ‘সবকিছুই প্রায় চূড়ান্ত। আশা করছি আগামী মিটিংয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া যাবে।’

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, সভায় বেতন কাঠামোর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে পেনশন, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য ভাতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতন চূড়ান্ত না হওয়ায় এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নবম পে স্কেলের সর্বনিম্ন বেতন কত হবে এ বিষয়ে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি, ফলে আগামী ২১ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় পরবর্তী বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। সিদ্ধান্তের আগে কমিশনের চেয়ারম্যান অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষপর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করবেন। প্রাথমিকভাবে নবম পে স্কেলে বেতনের অনুপাত ১:৮ ধরে সুপারিশ চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কমিশন সূত্র জানিয়েছে, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হলেও এর ঘোষণা কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন আয়োজনে জোর প্রস্তুতি চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার, ফলে আর্থিক সংকট বিবেচনায় নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নেই।

তবে পে কমিশন প্রতিবেদন জমা দিলে সে অনুযায়ী একটি বেতন কাঠামোর সুপারিশমালা চূড়ান্ত করবে বর্তমান সরকার, এবং নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা বাস্তবায়ন করবে। অবশ্য নতুন এ বেতন কাঠামো ঘোষণা ও বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীরা নিয়ম অনুযায়ী মহার্ঘভাতা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না। তার মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না এবং সেটাই যুক্তিযুক্ত।

তিনি আরও জানান, সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে তিনটি প্রস্তাব এসেছে প্রথম প্রস্তাবে ২১ হাজার টাকা, দ্বিতীয় প্রস্তাবে ১৭ হাজার টাকা এবং তৃতীয় প্রস্তাবে ১৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নবম পে স্কেল দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং পে কমিশনের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি জানান, কমিশনে ২১ সদস্য আছেন, যারা সবকিছু বিচার-বিবেচনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন এবং তখনই জানা যাবে কীভাবে এটি বাস্তবায়ন হবে এবং কখন ঘোষণা দেওয়া হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X