শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে কি রোজা কাজা করতে হবে?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
expand
এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে কি রোজা কাজা করতে হবে?

রমজান মাসে রোজা পালনের সময় চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে রোজাদারদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়। বিশেষ করে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করার প্রয়োজন হলে অনেকেই জানতে চান—এই পরীক্ষা করলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি পরে রোজা কাজা করতে হবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে একদিকে যেমন ইবাদতের প্রশ্ন জড়িত, অন্যদিকে তেমনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মূল ভিত্তি হলো ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে কিছু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে অথবা সফরে থাকলে সে পরে অন্য দিনে সেই সংখ্যা পূরণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য শরিয়তে সহজীকরণ রয়েছে এবং চিকিৎসা গ্রহণের কারণে রোজা ভাঙলে তা গুনাহ হিসেবে গণ্য হয় না।

আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় ইনসুলিন বা ইনজেকশন নেওয়া যাবে কি?

এন্ডোস্কপি হলো একটি চিকিৎসা পরীক্ষা, যেখানে মুখ দিয়ে একটি সরু নল প্রবেশ করিয়ে পাকস্থলী বা খাদ্যনালির ভেতর পর্যবেক্ষণ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই পরীক্ষার সময় গলার ভেতর দিয়ে যন্ত্র প্রবেশ করে এবং অনেক সময় সামান্য তরল বা জেল ব্যবহার করা হয়। ফিকহগণের মতে, যদি এন্ডোস্কপির সময় কোনো তরল বা ঔষধ পাকস্থলীতে পৌঁছে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে। কারণ এখানে গলার স্বাভাবিক পথ ব্যবহার করে কিছু ভেতরে প্রবেশ করছে, যা রোজা ভাঙার মৌলিক শর্তের অন্তর্ভুক্ত।

তবে যদি এমন এন্ডোস্কপি করা হয় যেখানে কোনো তরল বা পুষ্টিকর উপাদান পাকস্থলীতে প্রবেশ না করে এবং শুধু যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়, তাহলে কিছু আলেমের মতে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু বাস্তব চিকিৎসায় সাধারণত সম্পূর্ণভাবে তরল ছাড়া এন্ডোস্কপি করা হয় না। তাই অধিকাংশ সমসাময়িক ফিকহবিদের অভিমত হলো—এন্ডোস্কপি করলে নিরাপদ মত অনুযায়ী রোজা ভেঙে যাবে এবং পরে কাজা আদায় করতে হবে।

কোলনস্কপি হলো একটি পরীক্ষা যেখানে পায়ুপথ দিয়ে যন্ত্র প্রবেশ করিয়ে বৃহদান্ত্র বা কোলন পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষার ক্ষেত্রেও প্রায়শই পানি, জেল বা বাতাস প্রবেশ করানো হয়, যাতে অন্ত্র পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। ফিকহের দৃষ্টিতে পায়ুপথ একটি স্বাভাবিক দেহগহ্বর এবং এ পথে কোনো তরল ভেতরে প্রবেশ করলে তা রোজা ভাঙার কারণ হয়। হানাফি মাজহাবসহ অধিকাংশ আলেমের মতে, কোলনস্কপির সময় ব্যবহৃত তরল বা উপাদান ভেতরে প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা ওয়াজিব হবে।

আরও পড়ুন ঃ ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখবেন কীভাবে? ডাক্তারি পরামর্শ।

এই বিষয়ে আধুনিক ফিকহ একাডেমি ও আলেমদের ফতোয়াতেও একই কথা বলা হয়েছে। তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, এন্ডোস্কপি ও কোলনস্কপির মতো পরীক্ষাগুলো যদি রোজার সময় করা হয় এবং এতে কোনো তরল বা ওষুধ শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে এটি চিকিৎসাজনিত কারণে হওয়ায় এতে কোনো গুনাহ নেই, শুধু পরে কাজা আদায় করলেই যথেষ্ট।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর অবস্থা। যদি কারও জন্য এই পরীক্ষা জরুরি হয় এবং দেরি করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে শরিয়ত তাকে রোজা ভাঙার অনুমতি দেয়। কারণ ইসলামে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো কষ্ট আরোপ করতে চান না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এটি প্রমাণ করে যে, চিকিৎসার প্রয়োজনে রোজা ভাঙা শরিয়তসম্মত।

আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা হয়?

সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে সাধারণত রোজা ভেঙে যায়, কারণ এসব পরীক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তরল বা উপাদান শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে। তবে এটি চিকিৎসাজনিত হওয়ায় গুনাহ নয় এবং শুধু কাজা আদায় করলেই যথেষ্ট, কাফফারা লাগবে না। যদি সম্ভব হয়, তাহলে এই পরীক্ষাগুলো রোজার সময়ের বাইরে করা উত্তম। কিন্তু জরুরি প্রয়োজন হলে শরিয়ত অনুযায়ী রোজা ভেঙে পরীক্ষা করানো সম্পূর্ণ বৈধ।

সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সমসাময়িক ফিকহি মতামতের আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোজা কাজা করতে হবে। এটি মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং শরিয়তের সহজীকরণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X