

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রমজান মাসে রোজা পালন করতে গিয়ে অনেক রোজাদারকে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, নিউমোনিয়া বা অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রজনিত সমস্যার কারণে অক্সিজেন বা নেবুলাইজার নিতে হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—রোজা অবস্থায় অক্সিজেন বা নেবুলাইজার গ্রহণ করলে কি রোজা ভেঙে যায়, নাকি রোজা সহিহ থাকে। বিষয়টি ইসলামি ফিকহ ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে পরিষ্কারভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি শরিয়তে রোজা ভাঙার মৌলিক নীতি হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা খাদ্যসদৃশ কোনো বস্তু স্বাভাবিক পথ দিয়ে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে সে পরে অন্য দিনে সেই সংখ্যা পূরণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, অসুস্থ ব্যক্তির জন্য শরিয়তে সহজীকরণ রয়েছে এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে নেওয়া কোনো বিষয়কে গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
আরও পড়ুন ঃ ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখবেন কীভাবে? ডাক্তারি পরামর্শ।
অক্সিজেন নেওয়ার বিষয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে স্পষ্ট মতামত রয়েছে। অক্সিজেন মূলত একটি গ্যাস, যা শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে। এটি খাদ্য নয়, পানীয় নয় এবং পুষ্টিকর কোনো বস্তু হিসেবেও গণ্য হয় না। আধুনিক ফিকহবিদরা একমত যে, রোজা অবস্থায় অক্সিজেন নেওয়া রোজা ভাঙে না। কারণ এতে এমন কিছু শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে না, যা রোজা ভাঙার শর্ত পূরণ করে। ইসলামি ফিকহ একাডেমি এবং বহু সমসাময়িক আলেম অক্সিজেন গ্রহণকে শ্বাস নেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
নেবুলাইজারের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রাখে। নেবুলাইজার একটি চিকিৎসা যন্ত্র, যার মাধ্যমে তরল ওষুধকে বাষ্পে রূপান্তর করে শ্বাসনালিতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই বাষ্প ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে। প্রশ্ন হলো, এই বাষ্প কি রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত কি না। অধিকাংশ সমসাময়িক ফিকহবিদের মতে, নেবুলাইজারের মাধ্যমে প্রবেশ করা ওষুধ খাদ্য বা পানীয়ের মতো নয় এবং তা সরাসরি পাকস্থলীতে পৌঁছায় না। বরং এটি শ্বাসনালিতে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই সাধারণভাবে নেবুলাইজার ব্যবহার করলে রোজা ভাঙে না।
আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা হয়?
তবে কিছু আলেম সতর্কতামূলক মত দিয়েছেন যে, নেবুলাইজারের ওষুধ যদি ঘন তরল আকারে থাকে এবং তার উল্লেখযোগ্য অংশ পাকস্থলীতে পৌঁছার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে রোজা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়, নেবুলাইজারের ওষুধ খুবই অল্প পরিমাণে বাষ্প হয়ে শ্বাসনালিতে যায় এবং তা খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ কারণেই অধিকাংশ ফিকহ পরিষদ এটিকে রোজা ভাঙার কারণ হিসেবে গণ্য করেননি।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহ কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা তিনি অবতীর্ণ করেননি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৭৮)। এই হাদিস প্রমাণ করে যে, চিকিৎসা গ্রহণ ইসলামসম্মত এবং তা ইবাদতের পথে বাধা নয়। রোজা অবস্থায় শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন বা নেবুলাইজার নেওয়া জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোগীর শারীরিক অবস্থা। যদি কেউ অক্সিজেন বা নেবুলাইজার না নিলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে শরিয়ত তাকে কোনোভাবেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে বলে না। ইসলামের মূলনীতি হলো, নিজের জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৯৫)। এই আয়াত স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ করা ফরজের কাছাকাছি দায়িত্ব।
আরও পড়ুন ঃ এন্ডোস্কপি বা কোলনস্কপি করলে কি রোজা কাজা করতে হবে?
সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় অক্সিজেন নেওয়া নিঃসন্দেহে জায়েজ এবং এতে রোজা ভাঙে না। নেবুলাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য আলেম ও ফিকহ পরিষদের মতে রোজা ভাঙে না, কারণ এটি খাদ্য বা পানীয় নয় এবং পুষ্টি সরবরাহ করে না। তবে কেউ যদি অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে চান এবং সম্ভব হয়, তাহলে রোজার সময়ের বাইরে নেবুলাইজার ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে রোজা রেখে অক্সিজেন বা নেবুলাইজার গ্রহণ করা সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত।
সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সমসাময়িক ফিকহি বিশ্লেষণের আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—রোজা রেখে অক্সিজেন বা নেবুলাইজার নেওয়া যাবে এবং এতে রোজার ক্ষতি হয় না। এটি মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং ইসলামের সহজ ও কল্যাণকর বিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মন্তব্য করুন

