শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ৪ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা হয়?

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
expand
রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা হয়?

রমজান মাসে রোজা রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে রোজা চলাকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তের নমুনা নেওয়া বা রক্তদান নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসে। বিশেষ করে তরুণ ও প্রবীণ রোজাদাররা ভাবেন, রোজা অবস্থায় রক্ত দিলে বা টেস্টের জন্য রক্ত নিলে কি রোজা ভেঙে যায়, রোজার সওয়াব কমে যায় কি না। এই বিষয়টি ইসলামিক ফিকহ এবং আধুনিক চিকিৎসা উভয় দিক থেকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

ইসলামে রোজা ভাঙার মূল কারণ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য, পানীয় বা যৌন ক্রিয়া গ্রহণ করা, যা সরাসরি পেটে বা গলায় প্রবেশ করে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা অসুস্থ বা সফরে থাকে, তারা পরে সেই সংখ্যক রোজা পূর্ণ করবে।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। অর্থাৎ, রোজা ভাঙার জন্য শর্ত হলো খাদ্য, পানীয় বা যৌন মিলন, আর অনিচ্ছাকৃত কোনো কাজ বা চিকিৎসাজনিত ক্ষতি রোজা ভাঙে না।

আরও পড়ুন ঃ ইনহেলার ব্যবহার করলে কি রোজা ভেঙে যায়?

রক্ত পরীক্ষা বা টেস্টের জন্য অল্প রক্ত নেওয়া রোজা ভাঙে না। ফিকহগণ এটিকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ এবং ‘শারীরিক ক্ষতি সীমিত’ হিসাবে বিবেচনা করেছেন। হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি এবং হাম্বলি—চার মাজহাবের আলেমরা একমত যে, রোজা চলাকালীন স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, যেমন রক্তের নমুনা নেওয়া, রোজা ভাঙে না। ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া এবং রাদ্দুল মুহতার মতো গ্রন্থে উল্লেখ আছে, সীমিত পরিমাণ রক্ত নেওয়া রোজার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।

রক্তদান, যেখানে পরিমাণ অনেক বেশি হয়, সেখানে আলেমদের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। হানাফি ও শাফেয়ি মাজহাবের অধিকাংশ আলেম মনে করেন, স্বেচ্ছায় রক্ত দান করার ফলে রোজা ভাঙে না, তবে যদি এর কারণে শারীরিক দুর্বলতা বা অসুস্থতার আশঙ্কা থাকে, তাহলে ডাক্তারি পরামর্শ অনুযায়ী রোজা ভাঙা যায়। এটি শরিয়তের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে, যেখানে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন ঃ রোজা অবস্থায় ইনসুলিন বা ইনজেকশন নেওয়া যাবে কি?

রোজা চলাকালীন রক্ত নিলে রোজা ভাঙার ভয় অনেক রোজাদারের মনে থাকে। তবে ফিকহগণ বলেছেন, সীমিত রক্ত গ্রহণ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রক্ত নেওয়া রোজা ভাঙার অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এটি খাদ্য বা পানীয় নয়, এবং রোজা ভাঙার মৌলিক শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসুস্থদের চিকিৎসা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন এবং বলেছেন, “মরীচিকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে দেওয়া হয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭১৬)। স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রক্ত নেওয়াও এই ধারায় পড়ে।

তবে কিছু সতর্কতা মনে রাখা প্রয়োজন। যদি রক্ত নেওয়ার ফলে শরীর দুর্বল হয়, মাথা ঘুরে যায়, বা শর্করার মাত্রা কমে যায়, তবে রোজা ভাঙা বা ভাঙার পরে কাজা করার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ রোজা থাকার সময়, বেশি রক্ত নেওয়া, অথবা সুগন্ধি ও অন্যান্য চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হলে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা রক্তদান করার আগে ডাক্তারি পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন ঃ ডায়াবেটিস রোগীরা রোজা রাখবেন কীভাবে? ডাক্তারি পরামর্শ।

ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এটিও বলা হয় যে, রোজা রক্ষা করার মূল উদ্দেশ্য হলো খাদ্য, পানীয় ও যৌন সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ। রক্ত নেওয়া বা স্বল্প রক্তদানের কারণে এই উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং এটি রোজাদারের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় এবং শরিয়তের অনুমোদিত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর তোমরা তোমার প্রাণ রক্ষা করো।” (সুরা আল-মাইদাহ, আয়াত: ৩)। এটি নির্দেশ করে যে, চিকিৎসাজনিত কার্যক্রম রোজার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ নয়।

সবশেষে বলা যায়, রোজা অবস্থায় স্বল্প পরিমাণে রক্ত নেওয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রক্ত দেওয়া বা প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তদান সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং জায়েজ। এতে রোজা ভাঙে না, রোজাদার দায়ী হয় না, এবং কাফফারা বা কাজা প্রয়োজন হয় না। তবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকলে, ডাক্তারি পরামর্শ অনুযায়ী রোজা ভাঙা এবং পরে পূর্ণ করা যায়।

সুতরাং কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের আলোকে বলা যায়—রোজা চলাকালীন স্বল্প পরিমাণে রক্ত নেওয়া বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য রক্ত দেওয়া রোজার ক্ষতি করে না। এটি সম্পূর্ণ বৈধ, স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এবং শরিয়ত সম্মত। রোজাদার নিশ্চিন্তে তা গ্রহণ করতে পারেন এবং রমজানের ইবাদতের উদ্দেশ্য বজায় রাখতে সক্ষম হবেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X