

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে এডিপির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিশেষ বরাদ্দের মালামাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দে কেনা এসব বাইসাইকেল, ছাগল, স্প্রে মেশিন, সেলাই মেশিন, ফুটবল ও হুইল চেয়ার বিএনপি ও জামায়াত নেতারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইতোমধ্যে উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা তাজুল ইসলাম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এক মাদ্রাসাছাত্রের নামে বরাদ্দ দেওয়া বাইসাইকেল নিজে স্বাক্ষর করে তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও কোটচাঁদপুর উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান নিজের ছেলের নামে নিয়েছেন বাইসাইকেল।
জানা গেছে, উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা তাজুল ইসলাম অন্যের বরাদ্দের সাইকেল তুলে নাতিকে উপহার দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য (ঝিনাইদহ-৩) মতিয়ার রহমনের নির্দেশে বুধবার দুপুরে বাইসাইকেলটি কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন ওই জামায়াত নেতা।
জানা গেছে, কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সাইমুন ইসলামের নামে একটি বাইসাইকেল বরাদ্দ করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র সাইমুনকে সেই সাইকেল না দিয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা তাজুল ইসলাম নিজেই মাস্টাররোল পত্রে স্বাক্ষর করে সাইকেলটি তুলে নেন। পরবর্তীতে সাইকেলটি তিনি মেজো ছেলের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
ভুক্তভোগী মাদ্রাসাছাত্র সাইমুন ইসলাম জানান, তার নামে বরাদ্দ হওয়া সাইকেলটি প্রথমে তাকে দেওয়া হয়নি। তার জন্মনিবন্ধনপত্র দিয়ে জামায়াত নেতা তাজুল ইসলাম বাইসাইকেলের বরাদ্দ নেন।
জানা গেছে, বিষয়টি জানাজানি হলে বুধবার তড়িঘড়ি করে সাইকেলটি মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাইমুন ইসলামের বাড়িতে পৌঁছে দেন জামায়াত নেতা।
এদিকে এডিপির আওতায় বরাদ্দকৃত এসব বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন ও স্প্রে মেশিন জামায়াত নেতার পাশাপাশি বিএনপির নেতারাও নিজেদের স্বজনদের মাঝে বণ্টন করেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
স্বচ্ছল হয়েও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাইসাইকেল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কোটচাঁদপুর উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় এমপির কাছ থেকে ছেলের জন্য সাইকেলটা চেয়ে নিয়েছি। এই বরাদ্দ মূলত এমপির নির্দেশনায় বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। এগুলো পত্রপত্রিকায় দিয়েন না প্লিজ।’
অন্যের বরাদ্দের সাইকেল তুলে নাতিকে উপহার দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত নেতা মাওলানা তাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাইকেলটি আমার প্রতিবেশী এক ছেলেকে দেওয়া হয়েছিল।’ যাকে বাইসাইকেল দেয়া হয়েছে তার পরিচয় জানতে চাইলে জামায়াত নেতা বলেন, ‘আমার মেজো ছেলে বেকার এবং আর্থিক সংকটে থাকায় সাইকেলটি তার মেয়েকে দিয়েছি। মারিয়া নামে মেয়েটি আমার পুতনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব নিয়ে কী হচ্ছে? বিএনপি জামায়াতের লোকজন এসব মালামাল ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তা এ নিয়ে আবার কী হচ্ছে?’
কোটচাঁদপুর উপজেলা বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন বুলবুল সিডল বলেন, ‘এমন ঘটনার খবর পেয়েছি। যদি এ ধরণের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে তা দুঃখজনক। সরকারি বরাদ্দ যদি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এভাবে ভাগাভাগি হয়ে থাকে, তবে প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে এর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’
মাওলানা তাজুল ইসলামের এই কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন কোটচাঁদপুর কামিল মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপাল ও সাবেক জামায়াত নেতা শের আলী। তিনি বলেন, ‘মাওলানা তাজুল ইসলাম মোটেও কোনো দরিদ্র মানুষ নন। তিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন, শহরে তার নিজস্ব বাড়ি আছে এবং সন্তানরাও ভালো চাকরি করেন। দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত বাইসাইকেল কৌশলে নিজের স্বজনকে দেয়ার ঘটনা একজন দায়িত্বশীল মানুষের পক্ষে নেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি।’
কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপা রানী সরকার বলেন, ‘সাইকেল বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শক্রমে সাইকেলটি ফেরত আনা হয়েছে এবং এটি নতুন করে প্রকৃত উপকারভোগীর মাঝে বিতরণ করা হবে।’
তিনি আরও জানান, বাইসাইকেল ছাড়াও সেলাই মেশিন, ছাগল, স্প্রে মেশিন বিতরণেও কোনো অনিয়ম হয়েছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

