

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘গণবিরোধী’ বলছে সমমনা ১১ দলীয় জোটের নেতারা। তাদের দাবি, হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনগণের দুর্ভোগ শতভাগ বাড়িয়ে দেবে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে আরও তীব্র করবে। এর প্রভাব সরাসরি পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের ওপর পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
জোট নেতারা অভিযোগ করেন, যখন দেশের মানুষ আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে, তখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে। জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ না করে জনগণের ওপর মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপানো অগ্রহণযোগ্য। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং জনগণবান্ধব নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এনপিবি নিউজকে বলেন, তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে সকল কিছু দাম বৃদ্ধি পাবে। কারণ সকল কিছু নির্ভর করে জ্বালানি তেলের দামের ওপর। দ্রব্যমূল্যে, পরিবহন, স্কুল কলেজগুলোতে এর প্রভাব পড়বে।
সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘সরকারের মধ্যেই অনেকে এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। সরকারের বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে পরোক্ষভাবে সিন্ডিকেট করে। তারা (সরকার) জনগণকে দেখানোর জন্য হয়তো নানান ধরনের পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকারের একটি অংশ এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকে।’
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিকে ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ‘দর সমন্বয়ের’ নামে সরকার যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে, তা গণবিরোধী, অমানবিক এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
ইরান আরও বলেন, সরকার যদি সত্যিই জনগণের কল্যাণ চায়, তবে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানির মূল্য হ্রাস করতে হবে। অন্যথায় জনগণ এই অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এনপিবি নিউজকে বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে বড় কোন সমস্যা নেই সরকার এমন বক্তব্য দেওয়ার পরেও দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। সমস্যা ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছিল। এমনি সকল জিনিসের দাম বাড়ছে, আবার তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে জিনিসের দাম আরো বেড়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারতো, কিন্তু আলোচনা না করেই তেলের দাম বাড়িয়েছে। এটা সরকারের একটি গোঁয়ার্তুমি। যারা ১৭ বছর মানুষের দুঃখের কথা বলেছে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, আর সেই সরকার একই কাজ করছে। আমরা তারা এটা কেন করছে এটা আমাদের বোধগম্য নয়।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এনপিবি নিউজকে বলেন, সরকারের অপরিণাম দূরদর্শী ও গণবিরোধী সিদ্ধান্ত। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে জনজীবনে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। দেশের উৎপাদন পরিবহনসহ জনজীবনের অনেক কার্যক্রমের সাথে জ্বালানী তেলের সম্পর্ক রয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, ফলে কস্টিং হিসেবে দ্রব্যমূল্যে যুক্ত হবে। ফলে মানুষের জীবনে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হবে। এই সরকারের আমলে অনেক দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে দাম বাড়লে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হবে।
তিনি বলেন, সরকারের গণবিরোধী কাজ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সরকারের কাজ হল জনগণকে সেবা দেয়া, স্বস্তিতে জীবনযাপন করতে দেয়া। কিন্তু সরকার কার্যত দুই মাসে যা করেছে তাদের সকল সিদ্ধান্ত জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তারা। সরকার পরিচালনায় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতা রয়েছে। বড় কথা হচ্ছে করাপশন বেড়ে গেছে। তেলের কৃত্রিম সংকট। তাদের দলীয় নেতারাই মজুতদারি করে, গোয়াল ঘরেও তেল পাওয়া যায়। একদিকে তারা বলছে জ্বালানি সংকট নেই, অন্যদিকে পাম্পে তেল পাওয়া যায় না। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের প্রতি জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে, জনরোষ বেড়ে যাবে।
এর প্রতিবাদে কোন ধরনের কর্মসূচি থাকবে কিনা জানতে চাইলে হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, ১১ দলের ইতোমধ্যে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। কর্মসূচি চালিয়ে যাব। যদি সরকার না শোনে তারপরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ এনপিবি নিউজকে বলেন, অতীতে কখনো এক ধাপে জ্বালানি তেলের দাম এত টাকা বৃদ্ধি করা হয়নি। ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে, ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়নি। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহনের ভাড়া, বিমান ভাড়া বেড়ে যাবে এবং বাংলাদেশের সমস্ত জিনিসের উপর এর প্রভাব পড়বে। গরিব মানুষের জীবন যাপন করা দুঃসহ হয়ে পড়বে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী হলেও বাংলাদেশে দর সমন্বয়ের নামে নতুন করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াত আমির এই প্রতিক্রিয়া জানান। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমূল্যে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘জনজীবনে এমনিতেই মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহে হাঁসফাঁস করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এটি হবে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।’
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যে এবার দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম আজ থেকে কার্যকর হয়েছে।
মন্তব্য করুন