

নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নবগঠিত এ দলটিকে জামায়াত ৩০টি পর্যন্ত আসন ছেড়ে দিতে রাজি হলেও চার দশকের পুরোনো দল চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে ৪০টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি নয়।
জামায়াত আগে ১৮০ থেকে ১৯০ আসনে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও এখন দলটির সিদ্ধান্ত, অন্তত ২০০ আসনে ধানের শীষের বিরুদ্ধে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী থাকতে হবে।
জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলের নির্বাচনী সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে। দলগুলোর পরিকল্পনা ছিল, ১২ জানুয়ারি ৩০০ আসনে দলগুলোর একক প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। আসন সমঝোতা না হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল সোমবার জানিয়েছেন, বুধবারের মধ্যে সব দল একসঙ্গে গণমাধ্যমে সামনে এসে একক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করবে।
তবে দলগুলোর নেতারা বলেছেন, আসন সমঝোতার সমাধানের পরিবর্তনে জটিলতা আরও বেড়েছে। প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন না পেলে ইসলামী আন্দোলন ও এবি নির্বাচনী সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
দলগুলোর সূত্রের খবর, জামায়াত-এনসিপির পর মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ইসলামী আন্দোলনসহ বাকি দলগুলোকে নির্বাচনী সমঝোতায় ধরে রাখতে ‘আন্তরিকতা’ দেখাচ্ছে না বলে এই দলগুলোর অভিযোগ।
১০০ আসন ছাড়ার পরিকল্পনা
এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় ক্ষুব্ধ অন্তত ৭০ আসন চাওয়া চরমোনাই পীরের দল। মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফতকে জামায়াত ১৪টি আসন ছাড়তে রাজি হলেও দলটি আরও কয়েকটি আসন চায়। এবি পার্টিকে তিনটি ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত।
এবিকে ছেড়ে দেওয়া দুটি আসনে প্রার্থীও দেয়নি জামায়াত। তবে দলটি বলছে, সম্মানজনক সংখ্যক আসন না পেলে তাদের পক্ষে জোটে থাকা কঠিন হবে।
বিএনপির জোট ছেড়ে এলডিপিকে সাতটি আসন ছাড়ে জামায়াত। তবে এর দুটি চরমোনাই পীরের দল ছাড়তে রাজি নয়। মাওলানা বাছেদ আযাদের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস ১৫ আসন পেয়েছিল। জামায়াত এ দলকেও সাতটি আসন ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে দলীয় জরিপের পর এলডিপির মতো খেলাফতকেও পাঁচটি আসন ছাড়তে চায় জামায়াত।
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী আন্দোলনকে ৪০, এনসিপিকে ২৮ থেকে ৩০, বাংলাদেশ খেলাফতকে ১৪, খেলাফত ও এলডিপিকে পাঁচটি করে এবং এবি পার্টিকে তিনটি আসন ছাড়া হবে। অপর চার শরিক নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন, জাগপা এবং বিডিপিকে সাকল্যে চার-পাঁচটি আসন ছাড়া হবে। বাকি ২০০ আসনে জামায়াত নির্বাচন করবে।
প্রয়োজনে কয়েকটি আসন উন্মুক্ত থাকবে। অথবা একাধিক শরিক দলকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তাদের নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে হবে।
চরমোনাইর দল ক্ষুব্ধ
জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নেতারা চুপ থাকলেও সামাজিক মাধ্যমে দল দুটির কর্মী-সমর্থকরা বাহাসে জড়িয়েছেন আসন সমঝোতা নিয়ে। ই
সলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা বলেছেন, ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার তত্ত্ব দিয়েছিলেন দলের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। জামায়াত এতে যুক্ত হয়। কিন্তু এখন আসন ছাড়তে চাইছে না।
ইসলামী আন্দোলন শুরুতে ১৫০ আসন চেয়েছিল। পরে দলটি ১২০ আসনের তালিকা দেয়। এরপর দলটি ১০০ আসন চায়। সবশেষ অবস্থান হলো ৭০ আসনের কমে তারা জোট করবে না। ২৬৬ আসনে দলটি একাই নির্বাচন করার কথা বলছে।
যদিও জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলনের নেতারা সংবাদমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এই টানাপোড়েনের কথা স্বীকার করছেন না। ১১ দলের সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচনী সমঝোতা ভেঙে যাচ্ছে, এমন কোনো পরিবেশ নেই। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলোচনা চলছে। দু-একদিনের মধ্যে যা চূড়ান্ত হবে।
একই রকমের বক্তব্য দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনূস আহমদ সেখ।
জামায়াত সূত্রের ভাষ্য, ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম আসন সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে গেছে। তিনি অন্য নেতাদের চেয়ে আসনের বিষয়ে অনড়।
দলীয়ভাবে চালানো তিনটি জরিপের বরাতে জামায়াত নেতারা কাছে দাবি করেছেন, ইসলামী আন্দোলনের ভোট সারাদেশে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে জোয়ার তুলতে বৃহত্তর ইসলামী ঐক্যের আবহ তৈরি করা প্রয়োজন, তাই দলটির সঙ্গে জামায়াত সমঝোতা ভাঙতে চায় না। কিন্তু ৪০ আসনে না মানলে, সমঝোতা ভেঙে যেতে পারে।
জামায়াত যে ৪০ আসন ছাড়তে চাইছে, তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে চরমোনাইর পীরের দলের।
একাধিক নেতা বলেন, জামায়াত ময়মনসিংহ, ঢাকা এবং বরিশাল বিভাগের ১১৫টি থেকে ইসলামী আন্দোলনকে আসন ছাড়তে চাইছে। উত্তরবঙ্গ, খুলনা বিভাগ, চট্টগ্রাম অঞ্চলের যেসব আসনে জামায়াতের শক্তি রয়েছে, সেখানে আসন ছাড়তে চাইছে না।
জামায়াত যেসব আসনে দুর্বল, সেগুলো ইসলামী আন্দোলনকে ছেড়ে দিলে জোট করে কী লাভ- প্রশ্ন তুলে দলটির নেতারা বলেন, জামায়াত তাদের শক্ত অবস্থান থাকা রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের তিনটি এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছে।
মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গাসহ যেসব এলাকায় জামায়াত শক্তিশালী, সেগুলোও এনসিপিকে ছাড়ছে। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ইসলামী আন্দোলনের সূত্র জানিয়েছে, ফয়জুল করীম দলীয় প্রার্থীদের বার্তা দিয়েছেন, প্রয়োজনে একা নির্বাচন করবেন। কিন্তু এনসিপিকে গুরুত্ব দিয়ে, ইসলামী আন্দোলনকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা মানা হবে না।
এনসিপিকে অগ্রাধিকার
জামায়াতের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা কাছে দাবি করেছেন, তাদের দলীয় জরিপ অনুযায়ী এনসিপির জনসমর্থন ৭ শতাংশ। সাংগঠনিক শক্তি না থাকায় দলটি এই জনসমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করতে পারবে না।
ফলে এসব ভোট বিএনপিতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। আবার আগামী নির্বাচনে জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি টাটকা থাকবে, অভ্যুত্থানের নেতাদের দল হিসেবে এনসিপিকে তাই জামায়াতের প্রয়োজন। জামায়াত নিজের সংগঠনের মাধ্যমে এনসিপির জনসমর্থনকে ভোটে পরিণত করবে।
জামায়াত কিছু আসন উন্মুক্ত রাখার কথা বললেও এই নীতি এনসিপির জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে না। দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্যদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে- এনসিপিকে যেসব আসন ছেড়ে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আপত্তি করা যাবে না। অন্য দলগুলো সেখানে প্রার্থী রাখতে পারবে না।
জামায়াতের আরেকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, সাংগঠনিক শক্তি বিবেচনায় এনসিপিকে ১০টির বেশি আসন ছাড়া উচিত নয়। কিন্তু দলটির নেতাদের জাতীয়ভাবে পরিচিতি এবং জুলাইয়ের ভূমিকার কারণে আসন ছাড়তে হচ্ছে। তাদের জেতাতে জামায়াতকে দলীয় প্রার্থীর মতো পরিশ্রম করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়া আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সোমবার জানিয়েছেন, শাপলা কলি প্রতীকে তারা ৩০ আসনে নির্বাচন করবেন।
গত রোববার এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দেখা করেন জামায়াতের আমিরের সঙ্গে। গতকাল তিনি সাক্ষাৎ করেছেন খেলাফত আমির মামুনুল হকের সঙ্গে।
জামায়াত সূত্রের ভাষ্য, জামায়াত, এনসিপি ও খেলাফতের নির্বাচনী সমঝোতা অটুট থাকবে। এবি পার্টিও শেষ পর্যন্ত থাকবে। সংশয় রয়েছে শুধু ইসলামী আন্দোলনকে নিয়ে।
অন্যান্য দলেও ক্ষোভ
ইসলামী আন্দোলনকে যেসব আসন জামায়াত ছাড়তে রাজি হয়েছে, সেগুলোতেও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। কিন্তু খেলাফতকে ছেড়ে দেওয়া ১৪ আসনের ছয়টিতে জামায়াত প্রার্থী দেয়নি।
এ দলটি আরও কয়েকটি আসনের দাবি করলেও জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, খেলাফতকে ২০টি আসন ছাড়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু এনসিপি, এলডিপি, এবি পার্টি শেষ সময়ে সমঝোতায় যুক্ত হওয়ায় খেলাফতের কিছু আসন কমানো হয়েছে।
মামুনুল হকের খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেন, সমঝোতা না হলে ছেড়ে দেওয়া আসনের বাইরেও রিকশা প্রতীকের প্রার্থী থাকবেন।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, ২৭টি আসন চেয়ে জামায়াতকে তালিকা দেওয়া হয়। কিন্তু তিনটি আসন ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এত কম আসন নিয়ে সমঝোতায় থাকা যাবে কিনা, তা ভাবতে হচ্ছে।
এবি পার্টি জোটে না থাকলে প্রার্থী না দেওয়ায় সেখানে জামায়াত নির্বাচনে লড়তে পারবে না। তবে দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, এমন কিছুই ঘটবে না। ১১ দল ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনে লড়বে। সব দল তাদের চূড়ান্ত তালিকা দিয়েছে। একক প্রার্থী দু-এক দিনে ঠিক হয়ে যাবে।
গত ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন। এখন চলছে বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীদের আপিল, যা শেষে ২০ জানুয়ারির মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। এর আগেই আসন সমঝোতা করতে হবে দলগুলোকে।
সূত্র : সমকাল
মন্তব্য করুন