সোমবার
১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৭ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রভাব কতটুকু?

জিসান তাসফিক
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬ ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত একটি রীট পিটিশন দায়ের হয়েছে যা শুনানির জন্য ধার্য হয়েছে।

৭০ অনুচ্ছেদ অবৈধ ও বাতিলের জন্য আগেও রীট হয়েছে । বাতিল চাওয়ার কারণ হল এর floor crossing সংক্রান্ত নিয়ম। কোনো সংসদ সদস্য সংসদ অধিবেশনে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে বা দল ত্যাগ করলে বা পক্ষে ভোট দানে বিরত থাকলে তার সদস্যপদ বাতিল বলে গণ্য হবে। এই বিধান ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানেই যুক্ত এবং এর কারণ পাকিস্তান আমলে দলের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হয়েও সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে বা দল ত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দিয়েছে। ফলে সরকারের বারবার পতন হয়েছে। কিন্তু বিধানটি এমন ভাবে সংবিধানে যুক্ত আছে যে দল যদি কখনও স্বৈরাচারী আইন প্রণয়ন করার চেষ্টা করে তাহলে বিপক্ষে ভোট দেওয়া যায় না। অবশ্যই তখন দেশ ও জনগণের স্বার্থে দল ত্যাগ করলে সেই আসন কমে যাবে এবং সেই ভোট যুক্ত হবে না কিন্তু তা কেউ করে নাই।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন,১৯৯১ অনুযায়ী আইনের সংসদ অধিবেশনে প্রতিটি সংসদ সদস্য প্রকাশ্য ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবে। সাধারণত সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করে সংসদের স্পীকার বা ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সেখানে প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। যার ফলে দলের বিপক্ষে স্বাধীন ভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

এখানে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়, যেহেতু সংসদ সদস্য দলের বাহিরে গিয়ে ভোট দিতে পারবে না, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা কি? সরকার দলীয় সমর্থিত ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিলেই হয়। কিন্তু সময়ের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা ভিন্ন হয়। সংসদে কোন দল সংখ্যা গরিষ্ঠ হবে বা হবে না, দলীয় সরকার গঠন হবে নাকি একাধিক দলের সমন্বয়ে যৌথ বা জাতীয় সরকার গঠন হবে যা পূর্ব নির্ধারিত হয় না এবং এগুলো নির্ধারিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে। আবার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে নিরপেক্ষ ভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হলে সংসদ গোপন ভোট ব্যবস্থা রাখা যায় অথবা গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যায় অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা যায় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। কিন্তু judicial review বা বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে করা যায় না। রাষ্ট্রপতির প্রয়োজনে বিচার বিভাগ এই ক্ষেত্র সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮ ও ১০৮ অনুযায়ী পরামর্শ বা দিক নির্দেশনা দিতে পারে এবং রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৭৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই পরামর্শ পর্যালোচনা জন্য সংসদকে জানাতে পারে, এই পুরো প্রক্রিয়াকে বলে doctrine of separation of power এবং doctrine of check and balance.

রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) অনুযায়ী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান তবে নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীই সংসদের নেতা। যার ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণভোটে প্রয়োজনীয়তা বা গোপন ব্যালটে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাকে কোনো সরকারকে প্রয়োজন মনে করতে দেখা যায় নি যা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অসামঞ্জস্য প্রতীয়মান হয় না।

তবে প্রশ্ন আসে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কি গণতন্ত্র নাই? রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে গণতন্ত্র নাই তবে পরোক্ষভাবে আছে। কারণ সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং দলীয় ভাবে যখন নির্বাচিত হয় তখন ব্যক্তিগত ভাবে নয় বরং সেটি সামষ্টিক ভাবে ছিল। জনগণ দল, দলের অবস্থান, দলের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেখেই ভোট দিয়ে থাকে। সামষ্টিক বিষয়ে বিশেষ বিধান বা সুযোগ না থাকা পর্যন্ত সবাইকে দলীয় নীতিতে চলতে হয়, যেমন সংসদে যারা বিরুদ্ধে ভোট দেয় এবং হেরে যায় তাদের জন্য সংসদ কার্যকারিতা কমে না বরং সংসদই আইন পাশ হয় এবং সংসদে কে পক্ষে থাকবে কিংবা থাকবে না সেটি সংসদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হয় কিন্তু পাশ হওয়া ভোটই বাহ্যিক ভাবে সকলের উপর প্রয়োগ হয়।এই কারণে অনুচ্ছেদ ৭০ বাতিল হওয়ার প্রয়োজন নেই ।

যে প্রয়োজনে এই রীট হয়েছে তাকে বলা Judicial review যা মূলত সংবিধান অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী হয়ে থাকে। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদ ও সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের মতই মূল সংবিধানের বিষয়। এধরনের বিষয় সংবিধান সংশোধন আইন বা সাধারণ আইনের প্রণয়ন ক্ষেত্রে সংবিধানের মৌলিকত্ব রক্ষা ব্যবহারিত হয়। কিন্তু মূল সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ আর আরেকটি অনুচ্ছেদ অসামঞ্জস্য বলে বাতিল করলে তখন অনেক বিশেষ বিধানও যেগুলো বিশেষ প্রয়োজনে রেখেছে সেগুলো বাতিল করার জন্য চেষ্টা করা হবে। সংবিধান রক্ষায় ও ব্যাখ্যায় বিশৃঙ্খলা আসতে পারে এবং মৌলিকত্ব নষ্ট হতে পারে। এখানে আইনের একটি বিশেষ নীতি হল যে একাধিক অসামঞ্জস্য বিধান থাকলে তা এমন ভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে ফলে সেই ব্যাখ্যা যেন উভয় নিয়মই টিকে থাকে। যাকে rule of harmonious বলে। এ বাহিরে গিয়েছে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করে ৭০ অনুচ্ছেদ সব অন্যান্য অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংবিধানের অন্যান্য নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যতা তৈরি করা যাবে।

৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করা যাবে সংসদের মাধ্যমে। যেমন কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার , ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা , দলীয় বিবেচনা সাপেক্ষে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষমতা দেওয়া যাবে। আবার দল ত্যাগ করলে সংসদ পদ বাতিল হবে। সংসদীয় অধিবেশনে বিস্তারিত আলোচনা - পর্যালোচনার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে।

জিসান তাসফিক

শিক্ষানবীস আইনজীবী, ঢাকা আইনজীবী সমিতি

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank