বুধবার
২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাহাড়জুড়ে বারুদের গন্ধ মুহুর্মুহু গোলার আওয়াজ, কোন পথে যাচ্ছে কাশ্মীর!

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত।
expand
ছবি : সংগৃহীত।

১৯৭১ এর পর আবারও বড় ভাঙনের মুখে জিন্নাহর পাকিস্তান! পাকিস্তানে চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। স্বাধীনতাকামী পাকিস্তান অধ্যুষিত আজাদ কাশ্মীরের লক্ষ জনতা নেমে এসেছে পথে। চারদিকে বিকট গুলির শব্দ, রাজপথ জুড়ে জমাট বাঁধা রক্ত। মুহূর্তের মধ্যেই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের একাধিক এলাকা। নিষিদ্ধ ঘোষিত জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (JAAC) সাথে নিরাপত্তা কর্মীদের ভয়ংকর সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংকট এখন বিস্ফোরক সংঘর্ষে রুপ নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরো এলাকা জুড়ে ভয়ংকর সহিংসতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে কাশ্মীর কি আরো ভয়াবহ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নাকি পূর্ব পাকিস্তানের মতো স্বাধীনতার পথে হাঁটছে ? কাশ্মীরের পাহাড় ঘেরা নৈসর্গিক ভূ-খণ্ডে রাজনীতির উত্তাপ এখন রুপ নিয়েছে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে। নির্বাচনের আগেই বিক্ষোভ সংঘর্ষ আর গুলির শব্দে থমকে গেছে স্বাভাবিক জীবন। গোটা কাশ্মীর জুড়ে স্বাধীনতাকামী মানুষের বুকে জ্বলে উঠা ভয়ঙ্কর আগুন যেন শাহবাজ প্রশাসনের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি উপত্যকা যেখানে একসময় পাহাড়ের কোল বেয়ে ছুটে চলতো মুক্তোর মত নদী, একটি জনপদ যেখানে ঘাসের ডগায় শিশির জমতো আর বাতাসে ভেসে বেড়াতো বসন্তের গান কিন্তু আজ সেখানে জমাট বাঁধা আতঙ্কের মেঘ, আজ সেখানে নদীর জলও যেন লাল। আজ সেখানে মানুষের স্বপ্নগুলো বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন। কাশ্মীর যেনো সেই হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী যার ভাগ্য লেখা হয়েছিলো বিভাজনের রক্তমাখা কলমে।

১৯৪৭ সাল উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক চিরকালীন বাঁক। ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান। জন্ম নিলো স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তান। কিন্তু বিভাজনের ছায়ায় জন্ম নিল আরেক গভীর বিভক্তি। গভীর ক্ষত। মধ্যবর্তী ইতিহাসও কম কিছু নয়। তারপর বহু চড়াই উতরাই পেরিয়ে তৈরি হল 'লাইন অব কন্ট্রোল' নামের দুই কাশ্মীরের বিভাজন রেখা। ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তির মধ্যে দিয়ে 'লাইন অব কন্ট্রোল' বা নিয়ন্ত্রণ রেখা চূড়ান্ত রূপ পায়।

কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রধানত তিনটি বড় যুদ্ধ (১৯৪৭-৪৮, ১৯৬৫, এবং ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ) সংঘটিত হয়েছে। উভয় দেশই সমগ্র কাশ্মীরের মালিকানা দাবি করে,যা বর্তমানে 'লাইন অব কন্ট্রোল' (LOC) বা নিয়ন্ত্রণরেখার মাধ্যমে বিভক্ত। এতকিছুর পরেও পরিস্থিতির দুর্বিষহ বিস্তৃতি কমে না। কাশ্মীরের ভাগ্য কাঁটা ছেঁড়ার মঞ্চে তৃতীয় পক্ষ হয়ে আবির্ভূত হয় চীন।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব দক্ষিণ এশিয়ার একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল বিষয়। '৪৭ এ দেশভাগের পর থেকে এই বিরোধ দুটি দেশের মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষের জন্ম দিয়েছে এবং এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করেছে। এই দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কাশ্মীরের ভৌগোলিক বিভাজন, সংঘাতের মূল কারণ, এর ফলে সৃষ্ট শরণার্থী আন্দোলন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত অত্যন্ত জটিল সমীকরণের দিকেই এগুচ্ছে।

৭ দশকের বেশি সময় পার হয়েছে কাশ্মীর প্রশ্নের কোন সমাধান হয়নি। বরং প্রতি বছর প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি সংঘর্ষ, প্রতিটি হারানো জীবন কাশ্মীরীদের হৃদয়ে আরোও গভীর করে তুলেছে অবর্ণনীয় শূন্যতা। কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল সমস্যা, যার শিকড় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় প্রোথিত। এই বিরোধের মূল কারণ হলো কাশ্মীরের ভৌগোলিক বিভাজন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, দুটি দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা। এই দ্বন্দ্বের ফলে বহুবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে এবং ব্যাপক শরণার্থী আন্দোলন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও অত্যন্ত নেতিবাচক, যা অঞ্চলের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করে। কাশ্মীর সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এখন অপরিহার্য।

কাশ্মীর এখন আর শুধুই একটি ভূখণ্ড নয়। কাশ্মীর এখন এক জীবন্ত ইতিহাস যেখানে ঘুমিয়ে আছে লক্ষ অদেখা কান্না। কাশ্মীর এখন এক নিশ্চুপ নদী। যে নদী বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে রক্তের স্মৃতি।

যে প্রশ্ন ৭ দশক আগে উঠেছিল আজও ঝুলে আছে হিমালয়ের বাতাসে। কাশ্মীর কি কখনো রক্ত মুক্ত হবে নাকি এই বিভক্তি হয়ে থাকবে উপমহাদেশের চিরকালীন অশ্রুবিন্দু।

লেখক: সাংবাদিক পল্লব মাহমুদ, সম্পাদক, অন্যলোক।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন