

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শারীরিক অসুস্থতার কারন দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে কে হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি? এমন জল্পনা, কল্পনা এখন দেশের প্রায় প্রতিটা নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ হলেও অলংকারিক ও মূলত নির্বাহী ক্ষমতাহীন। তবে এই অলংকারিক চরিত্রটি উজ্জল থাকে কেবল স্বাভাবিক রাজনীতি ও সুশাসনের সময়কালে। যখনই রাষ্ট্রে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট, সাংবিধানিক অচলবস্থা বা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখনই এই পদটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত প্রজ্ঞা ও অভিভাবকত্বের প্রতীক।
সংবিধানের চেতনা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অরাজনৈতিক, নির্দলীয় ও সবার শ্রদ্ধাভাজন হবেন; এমনটি প্রত্যাশিত হলেও বাস্তবে সম্পূর্ণ দলনিরপেক্ষ কোনো একক ‘সর্বজনগ্রাহ্য’ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বর্তমান সমাজে প্রায় অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে অতি-নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কোনো আমলা বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন করার সাম্প্রতিক গুঞ্জন দেশপ্রেমিক নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতন মহলকে গভীর উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বনাম অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি:
রাজনীতির অলিগলি না চেনা কোনো আমলা বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে রাষ্ট্রে সর্বাধিনায়কের আসনে বসালে কী ধরনের কৌশলগত বিপত্তি ঘটতে পারে, তা তলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংকটকালে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার অভাব: অরাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যক্তিরা প্রশাসনিক প্রটোকলে দক্ষ হলেও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রায়শই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তারা রাষ্ট্র ও দেশের বৃহৎ স্বার্থ রক্ষায় ত্বরিত ও সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ প্রমাণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে থাকেন। ফলস্বরূপ, চরম রাজনৈতিক সংকটকালে তারা এতটাই নমনীয় বা সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়েন যে, তা প্রকারান্তরে মূল রাজনৈতিক শক্তি ও দেশের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধেই বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনভর রাজনীতি করে আসা, সততা ও ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জ্যেষ্ঠ নেতাদের টপকে কোনো আমলা বা সুবিধাভোগীকে সুযোগ দিলে তা রাজনীতিবিদদের জন্য চরম অবমাননাকর। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে এবং তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি-বিমুখ করে তোলে।
রাজনৈতিক ভিত্তি না থাকায় একজন অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি অস্থিতিশীল সময়ে অসাংবিধানিক বা কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর হাতে সহজে রাজনৈতিক পাশা খেলার চালে পরিণত হতে পারেন।
ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার শিক্ষা: ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সংকটকালে একজন খাঁটি রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি এবং একজন অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি রাষ্ট্রের গতিপথ সম্পূর্ণ দুই বিপরীতমুখী ধারায় পরিচালিত করেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসেই এর দুটি উজ্জ্বল ও প্রত্যক্ষ উদাহরণ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন একজন পাকা রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানচেষ্টা তিনি অত্যন্ত সাহসিকতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তার সঙ্গে এক তুড়িতেই নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণেই তিনি প্রশাসনিক ও সামরিক মনস্তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন এবং রাষ্ট্রকে এক মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিলেন।
বিপরীতে ২০০৭ সালে মহামান্য ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন একজন সজ্জন কিন্তু অরাজনৈতিক শিক্ষাবিদ। রাজনৈতিক কৌশলের জটিলতা না বোঝার কারণে তিনি অসাংবিধানিক শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হন। তার সিদ্ধান্তহীনতা ও অতি-নমনীয়তার সুযোগ নিয়ে তথাকথিত মইন-মাসুদ চক্র ক্ষমতা দখল করে এবং দেশকে দীর্ঘস্থায়ী গভীর রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়।
অপরদিকে, শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ ছিল রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন একচ্ছত্র প্রশাসনিক মানসিকতা, যা সংকটকালীন মুহূর্তে জনগণের স্পন্দন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভাষা বুঝতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
অতএব, রাষ্ট্রপতি পদে কেবল একজন 'ভোলাভালা' বা ভালো মানুষ বসানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, ত্যাগ এবং সংকট মোকাবিলার মতো সাহসী নেতৃত্ব। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব দিয়ে আর যাই হোক, রাজনৈতিক ঝোড়ো হাওয়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জাঁদরেল সাবেক আমলা, অনভিজ্ঞ প্রবাসী ব্যক্তিত্ব কিংবা অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসানোর চিন্তা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ারই নামান্তর।
তাই চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, জাতীয়তাবাদী শক্তির মূলধারায় পরীক্ষিত, সৎ, সাহসী ও গভীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একমাত্র সঠিক ও যথোপযুক্ত বিকল্প। রাজনীতিকে রাজনীতিবিদের হাতে রাখাই রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান শর্ত।
লেখক: শেখ ফরিদ উদ্দিন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।