বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রয়টার্সের প্রতিবেদন

মক্কা চুক্তিতে যোগদান বিবেচনা করছে বাংলাদেশ, পরীক্ষার মুখে পররাষ্ট্রনীতি

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩২ এএম
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পতাকাগুলো পাশাপাশি। ছবি: এআই
expand
সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পতাকাগুলো পাশাপাশি। ছবি: এআই

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তবে এমন পদক্ষেপ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে এবং বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এতদ্ব বিষয়ে বিশদ আলোচনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স।

এর আগে সোমবার (২৪ আগস্ট) সাংবাদিকদের হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে তাতে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা অস্বাভাবিক নয়। বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের নেতৃত্বকে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে, চুক্তিতে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সৌদি আরব ঢাকাকে চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা জানায়নি সূত্রটি। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এসব তথ্য দেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট তাইয়্যেপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরবের মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর ছবি তুলছেন। ছবি: রয়টার্স

চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চুক্তিটিতে স্বাক্ষর করে। ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ চুক্তি করা হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।

তুরস্ক জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান ও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের সঙ্গে করা এ চুক্তি অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত।

পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরীক্ষা

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে। এত দিন প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক জোটগুলোর বাইরে থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে ঢাকা।

বাংলাদেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব পণ্যের বড় অংশ যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখো বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, এসব সম্পর্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে না। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে দেশটি কোন পক্ষের—এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাবের শঙ্কা

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এসেছে। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে ঢাকা। একই সঙ্গে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে জোর করে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র চলতি মাসে জানিয়েছেন, তারেক রহমান ভারত সফর করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

মক্কা চুক্তি প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির ওপর তারা গভীর নজর রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে নয়াদিল্লি স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানাবে না। তবে এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ঢাকাকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বিবেচনা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ শান বলেন, বাংলাদেশ কোনো জোটে যোগ দিয়েছে—এমন ধারণা তৈরি হলে বহুমুখী বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে ভারতসহ কয়েকটি দেশ খুশি হবে না। তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের ভিত্তি এটি হওয়া উচিত নয়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন