শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বন্ধের পথে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা, নিরাপত্তা ও রাজস্ব নিয়ে উদ্বেগ

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর রাইডশেয়ারিং শিল্প এক দশকের পথচলা অতিক্রম করেছে। ২০১৬ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই সেবা স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

শুরুতে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িকেন্দ্রিক থাকলেও পরে সিএনজি অটোরিকশাও রাইডশেয়ারিং সেবার আওতায় আসে।

তবে সম্প্রতি অ্যাপভিত্তিক সিএনজি রাইডশেয়ারিং সেবা বন্ধের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) রাইডশেয়ারিং নীতিমালা থেকে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

জানা গেছে, গত ৩ মে রাইডশেয়ারিং সেবাসংক্রান্ত অংশীজনদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিআরটিএ নীতিমালায় অ্যাপভিত্তিক সিএনজি অটোরিকশা সেবা বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সিদ্ধান্তটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ১৮টি রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান।

প্রায় ৩৫ হাজার যানবাহন এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যাত্রীসেবা দিচ্ছে। মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে যাত্রীরা সহজেই যানবাহন বুকিং, ভাড়া নির্ধারণ, চালকের পরিচয় যাচাই, অবস্থান ট্র্যাকিং এবং যাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অ্যাপভিত্তিক সিএনজি সেবা বন্ধ হলে শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হবে না, সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গত এক দশকে রাইডশেয়ারিং শিল্প বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আগে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, ভাড়া নিয়ে দরকষাকষি ছিল নিত্যদিনের বিষয়।

বর্তমানে অ্যাপভিত্তিক সেবার কারণে কয়েক মিনিটেই গাড়ি বুকিং, আনুমানিক ভাড়া জানা, চালকের পরিচয় যাচাই এবং যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি যাত্রার ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত হওয়ায় নিরাপত্তাও বেড়েছে।

রাইডশেয়ারিং শিল্প কর্মসংস্থান তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত এক দশকে হাজার হাজার চালক পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন পেশা হিসেবে এই খাতে যুক্ত হয়েছেন।

অনেক বেকার যুবক, চাকরিজীবী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা নিজেদের মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা সিএনজি ব্যবহার করে অতিরিক্ত বা প্রধান আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।

শুধু চালকরাই নন, এই খাতের বিস্তারের ফলে যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, গ্যারেজ, জ্বালানি, বীমা, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কাস্টমার সাপোর্টসহ বিভিন্ন খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাফায়েত হোসেন বলেন, আগে রাইডশেয়ারিংয়ে সিএনজি না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চলাচলে সমস্যা হতো। এখন অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই সিএনজি পাওয়া যায়। চালকের পরিচয় ও যাত্রার তথ্য সংরক্ষিত থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে না।

দীর্ঘদিন ইতালিতে বসবাসকারী মো. সিদ্দিক বলেন, প্রতিবছর দেশে এলে যাতায়াতের জন্য রাইডশেয়ারিং ব্যবহার করি। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বে অ্যাপভিত্তিক সিএনজি খুবই সুবিধাজনক ও নিরাপদ মনে হয়েছে। ডিজিটাল সেবা বন্ধ না করে আরও উন্নত করা উচিত।

রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় অ্যাপভিত্তিক সিএনজিচালক মো. হামিদ বলেন, আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রীর অপেক্ষায় থাকতে হতো। এখন অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীরাই আমাদের খুঁজে পান। এতে সময় বাঁচে এবং নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

মতিঝিলের আরেক চালক শামসুল বলেন, সম্প্রতি রাইডশেয়ারিংয়ে যুক্ত হয়েছি। অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রী পেতে অপেক্ষা করতে হয় না। ভাড়াও আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, তাই যাত্রীদের সঙ্গে কোনো বিরোধ হয় না।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও রাইডশেয়ারিং শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের ভাষ্য, অ্যাপের মাধ্যমে সম্পন্ন প্রতিটি লেনদেন ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত হওয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হচ্ছে।

একই সঙ্গে সরকার ভ্যাট, আয়করসহ বিভিন্ন রাজস্ব আদায়ে কার্যকর নজরদারির সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি নগর পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি, যাতায়াতে সময় সাশ্রয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

পাঠাও-এর এক প্রতিনিধি বলেন, পাঠাও-এর মাধ্যমে হাজার হাজার চালক নিয়মিত আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা সবসময় সরকারের প্রযোজ্য আইন ও নীতিমালা মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখব।

পাঠাও শুরু থেকেই এমন সেবা তৈরি করছে, যার জন্য গ্রাহকরা স্বেচ্ছায় মূল্য দিতে আগ্রহী। নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনই আমাদের মূল লক্ষ্য।

এ বিষয়ে উবারের বাংলাদেশে জনসংযোগ শাখার দায়িত্বশীল এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, তাঁরা দুদিন প্রতিবেদককে অপেক্ষমান রাখেন এবং পরবর্তীতে ওই এজেন্সির তরফ থেকে বলা হয়, এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি উবার।

ওভাই সলিউশন লিমিটেড এমজিএইচ গ্রুপের এস্যোসিয়েট ডিরেক্টর এবং রাইড শেয়ারিং অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (RSOAB) আহ্বায়ক সৈয়দ ফখরুউদ্দিন মিল্লাত বলেন, অ্যাপের মাধ্যমে সিএনজি সেবা মূলত যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও ভোগান্তিহীন যাতায়াত নিশ্চিত করে আসছে।

প্ল্যাটফর্মে থাকা প্রতিটি সিএনজির জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম ও চালকদের যাচাইকৃত তথ্য সাধারণ যাত্রীদের মনে একটি দৃঢ় আস্থা তৈরি করেছে। বিগত প্রায় ১০ বছর ধরে চলমান অ্যাপ-ভিত্তিক সিএনজি সেবা এখন হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া হলে সাধারণ মানুষ আবারও আগের মতো অনিরাপদ যাতায়াত ও চরম ভোগান্তির মুখে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ২০১৭-১৮ সালে রাইডশেয়ারিং সেবা জনপ্রিয় হতে শুরু করলে সিএনজি অটোরিকশা খাতে ব্যাপক ধস নেমে আসে এবং বাধ্য হয়ে চালক ও মালিকরা তখন আন্দোলনে গিয়েছিলেন।

আজ যদি বর্তমান সরকারের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির এই সময়ে এসে এই খাতকে ডিজিটালাইজেশনের আওতার বাইরে রেখে আবারো পিছিয়ে দেওয়া হয়, তবে এর সাথে জড়িত চালক, মালিক এবং সাধারণ যাত্রীস=বাই মারাত্মকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

তিনি বলেন, জনস্বার্থে বিআরটিএ ২০১৯ সালেই মন্ত্রণালয়ে 'রাইডশেয়ারিং এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট' গ্রহণ সাপেক্ষে অ্যাপে সিএনজি অটোরিকশা সেবা প্রদানের পক্ষে ইতিবাচক মতামত দিয়েছিল।

তাই একটি নিরাপদ ও আধুনিক যাতায়াত ব্যবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে, বিআরটিএ এবং সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টিকে নীতিমালায় যথাযথভাবে সংযোজন করে এর একটি দ্রুত ও ইতিবাচক সমাধান করা এখন সময়ের দাবি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অ্যাপভিত্তিক সিএনজি রাইডশেয়ারিং নীতিমালা থেকে বাদ দেওয়া হলে যাত্রী নিরাপত্তা, চালকদের কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সরকারের রাজস্ব-সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন