

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সাম্য আর দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জাতীয় কবির সাহিত্যকর্ম ও দর্শনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার এক বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার।
আগামী ১৮ জুন ২০২৬ থেকে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৭৪টি প্রত্যন্ত ও বিশেষায়িত উপজেলায় একযোগে শুরু হচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’-এর তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী কার্যক্রম।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলি নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং সচিব মিজ্ কানিজ মওলা এই মেগা-পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তবে এই আয়োজন কেবলই একটি বছরের উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি কবির হারিয়ে যাওয়া গৌরব পুনরুদ্ধার এবং নতুন প্রজন্মের মগজে নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা বুনে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ।
গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর মঞ্চ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। তিনি ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত সময়কালকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতি মন্ত্রী অতীতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদাসীনতার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান: বিগত ১৭ বছর বাংলা সাহিত্যে ও জাতীয় জীবনে জাতীয় কবির অসামান্য অবদান এবং দর্শনকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মূল শক্তির উৎসই ছিলেন নজরুল।
ইতিহাসের টেনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার আমলেও নজরুলের সাহিত্য প্রসারে অভূতপূর্ব কাজ হয়েছিল।
বর্তমান সরকার সেই ধারাবাহিকতায় কবি নজরুলের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।
এবারের ‘নজরুল বর্ষ’ উদযাপন কেবল মঞ্চের বক্তৃতা আর গান-কবিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবার জোর দিচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর।
অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণভাবে বর্ষটি পালনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠন করা হচ্ছে। এছাড়া তৈরি হচ্ছে অনন্য অফিসিয়াল লোগো, পোস্টার এবং বিশেষ ‘নজরুল বর্ষ ক্যালেন্ডার’। ডাক বিভাগ প্রকাশ করবে বিশেষ ‘স্মারক ডাকটিকিট’।
উৎসবের শেষেও যেন নজরুলের কাজ টিকে থাকে, সেজন্য কবির সাহিত্যকর্ম, দর্শন ও সঙ্গীত নিয়ে উচ্চতর গবেষণা এবং একটি আধুনিক ‘আর্কাইভ’ সৃষ্টির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি ও দর্শনকে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
এবার নজরুলের চেতনা কেবল রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোতে আটকে থাকবে না। চলতি অর্থ বছরের বাজেট থেকে দেশের প্রতিটি জেলা ও নির্দিষ্ট উপজেলাগুলোতে ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সম্পন্ন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো- পাহাড়, হাওর কিংবা সীমান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের মাঝেও নজরুলের দ্রোহ ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেওয়া।
সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর ভাষায়, আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহী কবির সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। আর এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার দেশের আপামর জনসাধারণ, বুদ্ধিজীবী মহল এবং গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেছে।
