

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দাঁত সুস্থ রাখতে ব্রাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দোকানে বা সুপারশপে পণ্যের সারিতে দেখা মেলে বিভিন্ন ধরনের টুথপেস্ট। এসব পণ্য বেছে নেওয়ার সময় অধিকাংশ মানুষ সাধারণত এর উপাদান, মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ, স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং কখনো কখনো স্বাদের বিষয় বিবেচনা করেন। টুথপেস্টের গায়ে সাধারণত লেখা থাকে—দাঁত সাদা করা, দাঁতের ক্ষয় রোধ, টার্টার নিয়ন্ত্রণ, মুখের দুর্গন্ধ দূর করা ইত্যাদি।
তবে টিউবের নিচে থাকা রঙিন দাগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল তথ্য ছড়িয়ে আছে। টুথপেস্টের টিউবের নিচে সাধারণত বিভিন্ন রঙের ছোট দাগ বা বার দেখা যায়। অনেকের ধারণা, এসব রঙ টুথপেস্টের উপাদান সম্পর্কে তথ্য দেয়।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য অনুযায়ী, টুথপেস্টের টিউবের নিচের ছোট রঙিন চিহ্ন দেখে এর উপাদান সম্পর্কে জানা যায়। এই দাবি অনুযায়ী—সবুজ রঙ মানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক; নীল রঙ মানে প্রাকৃতিক ও ওষুধযুক্ত; লাল রঙ প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণ; কালো রঙ সম্পূর্ণ রাসায়নিক।
কিন্তু বাস্তবে এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। টিউবের নিচের রঙিন চিহ্ন টুথপেস্টের ফর্মুলা বা উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় এই চিহ্ন তৈরি করা হয়। আলো শনাক্তকারী সেন্সর এই চিহ্ন পড়ে মেশিনকে জানায় কোথায় প্যাকেট কাটা, ভাঁজ বা সিল করতে হবে।
আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক পোর্টাল হেলথলাইনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আসলে টুথপেস্টের টিউবের নিচের এই রঙিন দাগগুলোর সঙ্গে এর উপাদানের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো শুধু টুথপেস্ট তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত একটি চিহ্ন, যা প্যাকেজিংয়ের সময় মেশিনকে কাটিং, ভাঁজ বা সিল করার জায়গা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টুথপেস্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কোলগেট জানিয়েছে, টুথপেস্টের কালার-কোডিং সিস্টেম বলতে বাস্তবে কিছুর অস্তিত্ব নেই। ওরাল কেয়ার কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করতে বা উপাদান লুকাতে এই চারকোনা দাগ ব্যবহার করে না। এগুলো কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র।
বিশ্বজুড়ে গুজব ও ভুয়া খবর উন্মোচনকারী সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম স্নোপস এবং বার্তা সংস্থা এএফপি ফ্যাক্ট-চেক এই দাবিটিকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ইন্টারনেট হক্স’ বা গুজব হিসেবে প্রমাণ করেছে।
তারা উৎপাদনকারী ডাই-কাটিং ও প্যাকেজিং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়েছে, প্যাকেজিং মেশিনের লাইট বিম সেন্সরকে সংকেত দেওয়ার জন্যই এই দাগ বা ‘আই মার্ক’ প্রিন্ট করা হয়।
বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন সায়েন্টিফিক আমেরিকান এই গুজবের একটি বড় বৈজ্ঞানিক ভুল ধরিয়ে দিয়েছে। গুজবে বলা হয় ‘কালো মানে সম্পূর্ণ কেমিক্যাল’। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাকৃতিক উপাদানই (এমনকি পানি এবং বাতাসও) এক একটি রাসায়নিক বা কেমিক্যাল। তাই প্রাকৃতিক বনাম কেমিক্যালের এই বিভাজনটিই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
এই চিহ্ন বিভিন্ন রঙের হতে পারে। শুধু সবুজ, নীল, লাল বা কালো নয়—বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং, সেন্সর ও মেশিন অনুযায়ী আলাদা রঙ ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এসব রঙের আলাদা কোনো অর্থ নেই।
শিল্পখাতের সেন্সর উৎপাদনকারী ব্র্যান্ড এক্সএসজেডের মতে, সেন্সর মূলত মানুষের চোখের মতো রঙ চেনে না। এটি মূলত ব্যাকগ্রাউন্ড এবং প্রিন্টেড মার্কের মধ্যকার ‘গ্রে-স্কেল কন্ট্রাস্ট’ বা আলোর তীব্রতার তারতম্য মেপে কাজ করে।
টিউবের সাদা অংশ থেকে গাঢ় রঙের আই মার্কের ওপর আলো পড়া মাত্রই আলো প্রতিফলনের এই বড় পরিবর্তন বা ‘ব্রাইটনেস ডেল্টা’ দেখে সেন্সরটি তাৎক্ষণিকভাবে একটি ইলেক্ট্রিক্যাল সুইচিং সিগন্যাল তৈরি করে মেশিনের মূল প্রসেসরে পাঠিয়ে দেয়। ফলে প্রতি মিনিটে হাজার হাজার প্যাকেট নির্ভুলভাবে প্রসেস করতে সাহায্য করে।
এএফপি ফ্যাক্ট-চেককে গ্লোবাল কসমেটিকস ফার্ম ‘অ্যাভন’-এর সিনিয়র প্যাকেজিং ইঞ্জিনিয়ার জোনাথন কুসু নিশ্চিত করেছেন, সিলিন্ডার আকৃতির টিউবগুলোর ডিজাইন যেন একদম ঠিক মাঝখানে থাকে এবং কাটিং রোবট যেন নিখুঁত পজিশন পায়, সেজন্যই এই অপটিক্যাল সেন্সর ট্র্যাকিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
টুথপেস্টে কী উপাদান রয়েছে তা জানতে হলে টিউব বা প্যাকেটের গায়ে লেখা উপাদানের তালিকা পড়তে হবে। বেশিরভাগ টুথপেস্টে সাধারণত নিচের উপাদানগুলো থাকে—টুথপেস্ট খোলার পর যাতে শক্ত হয়ে না যায়, সে জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ: গ্লিসারল ও সরবিটল। এছাড়া দাঁতের ময়লা ও খাবারের কণা দূর করা এবং দাঁত পালিশ করতে এটি ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ—ক্যালসিয়াম কার্বোনেট ও সিলিকা।
টুথপেস্টের টিউবের নিচের রঙিন দাগের সঙ্গে এর উপাদানের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই টুথপেস্ট বেছে নেওয়ার সময় এই রঙ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। টুথপেস্ট কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদনের সিল, মেয়াদ, উপাদানের তালিকা এবং নিজের পছন্দের স্বাদের বিষয় বিবেচনা করা উচিত। টুথপেস্ট নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা উদ্বেগ থাকলে ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।