


সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বাক্ষর নকল করে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে করা মামলায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাময়িক বহিস্কৃত) শাহাবুদ্দীন আহমদকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এ মামলায় আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন তিনি। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালত তার জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে কক্সবাজারের শাহপরীর দ্বীপ করিডোর দিয়ে মায়ানমার থেকে গরু আমদানি করা হলেও ২০১৯ সালের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সময়ে পুনরায় আমদানি কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা থেকে কক্সবাজারের ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন রবিন সরকারি অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করেন। এ জন্য তিনি স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তি খোরশেদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যিনি একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এর মহাপরিচালক ও যুগ্ম সচিব মফিদুল আলমের ভাই। সরকারি উচ্চপর্যায়ের সংযোগ থাকার কথা বলে খোরশেদ আলম তাকে গরু আমদানির অনুমোদন নিয়ে দিতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এক পর্যায়ে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলা হয়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সুপারিশসহ ৫ লাখ গরু আমদানি করার মঞ্জুরীপত্র ইস্যু করা হয়। পরে আলাউদ্দিন রবিন ঢাকায় এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিতে গেলে জানতে পারেন এমন কোন আবেদন মন্ত্রণালয়ে আসেনি। পরবর্তীতে এ ঘটনায় রাজধানীর পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করে ডিবি পুলিশ।
তদন্ত শেষে ৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা হয়। সেখানে উঠে আসে সংঘবদ্ধ এক প্রতারক চক্রের কারবার। যুগ্ম সচিবের ভাই থেকে শুরু করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ৫ জনের এই চক্র প্রতারণার মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়।
মামলার কোথাও নাম না থাকলেও সিআইডির তদন্তে উঠে আসে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাময়িক বহিস্কৃত) শাহাবুদ্দীন আহমদের নাম। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবুল কালাম তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের ২ মার্চ "কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত ২২ নং বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন নিয়ন্ত্রণাধীন যাত্রাপুর বিওপির বিট খাটালটি ১৪৩১ বঙ্গাব্দের জন্য নবায়ন/ পরিচালনার অনুমতি প্রদান প্রসঙ্গে" এমন আবেদন প্রথমে শাহাবুদ্দীন আহমদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গাকে পাঠানো হয়। জাফর ইকবাল পরে জাবেদ ও খোরশেদ আলমকে আবেদনের কপি হোয়াটসঅ্যাপ করেন। যেটার আদলে আরেকটি আবেদন তৈরি করতে বলা ব্যবসায়ী আলাউদ্দিনকে। যার মাধ্যমে তিনি ৩ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য আবেদন প্রস্তুত করে স্ক্যান কপি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খোরশেদ আলমকে পাঠান। এছাড়া শাহাবুদ্দীন ও জাফর ইকবালের হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথনে সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তার বদলির সুপারিশও পাওয়া যায়। আলাউদ্দিন রবিনের করা "কক্সবাজার জেলায় টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ মৌজার শাহ পরীর দ্বীপ বিওপিও ক্যাম্পের অধীনে সীমান্ত এলাকায় বিট/খাটাল স্থাপনের ৫ লাখ গবাদি পশুর আমদানির অনুমতি প্রদানের আবেদন প্রসঙ্গে" আবেদনের কপিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সুপারিশসহ স্বাক্ষর পুলিশ কর্মকর্তা শাহাবুদ্দীনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে জাফর ইকবালের নম্বরে পাঠানো হয়। যা পরবর্তীতে খোরশেদ আলমের হাত ধরে আলাউদ্দিনের কাছে আসে। পরবর্তীতে ১৯ মার্চ অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার নম্বর থেকে জাফর ইকবালের নম্বরে "তাজিনা সরোয়ার, উপসচিব (সীমান্ত-০৩ শাখা) জননিরাপত্তা বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়,ঢাকা" এর সীল ও স্বাক্ষরসহ একটি ভূয়া আদেশনামা পাঠানো হয়। তদন্তে জানা যায় শাহাবুদ্দীন আহমদের ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর জনৈক হজরত আলীর নামে রেজিষ্ট্রেশন করা। যার নামে দেশের বিভিন্ন থানায় একাধিক প্রতারণার মামলা রয়েছে। শাহাবুদ্দীন আহমদ নিজের পরিচয় গোপন রাখতে অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভুয়া ডকুমেন্ট পাঠাতেন।
আসামিরা নিজেদের মধ্যে এবং ভিকটিমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে ভুয়া অনুমোদনপত্র, আবেদনপত্র ও চুক্তিনামা আদান-প্রদান করত। বিশেষ করে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার স্বাক্ষরযুক্ত ভুয়া নথি বিভিন্ন সময় হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বিতর্কিত ডকুমেন্টে ব্যবহৃত স্বাক্ষরসমূহ প্রকৃত স্বাক্ষরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এগুলো জাল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। একইভাবে, উপ-সচিবের স্বাক্ষরও জাল বলে নিশ্চিত হয়।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/ ৪৭১ এবং ১০৯ ধারায় অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিরা হলেন, জাফর ইকবাল ওরফে রাঙ্গা, মো. আব্দুল্লাহ জাবেদ, খোরশেদ আলম, শাহাবুদ্দীন আহমদ ও মো. হযরত আলী।
বিট-খাটাল কি
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে স্থলপথে যেসব গরু, মহিষ বা অন্য চতুষ্পদ প্রাণী আনা হয় সেগুলোর সংখ্যা নির্ধারণ, ব্যবস্থাপনা এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রাণীগুলোকে সীমান্তবর্তী যে স্থানে রাখা হয় সেই স্থানটি খাটাল বা বিট বা বিট-খাটাল নামে পরিচিত। এর আভিধানিক অর্থ গোয়াল বা বাথান। বিট বলতে বোঝায়, সীমান্ত পার হওয়ার পর গবাদিপশু যেখান দিয়ে আসে। আর খাটাল হলো গবাদিপশু আনার পর যেখানে রাখা হয়।