


জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে শীঘ্রই। আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন নতুন মহাসচিব। ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া।
এবারের নির্বাচনে লাতিন আমেরিকা থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হতে পারেন বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ মহাসচিবের পদটি সাধারণত বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে পালাক্রমে বণ্টন করা হয়। সর্বশেষ লাতিন আমেরিকার মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার, যিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৮০ বছরে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি। তাই প্রথমবারের মতো একজন নারীকে এই পদে বসানোর জন্যও দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি রয়েছে।
বর্তমান মহাসচিব গুতেরেসের সময়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গাজা ও সুদানে সংঘাত এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন মহাসচিবের সামনে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।
ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট
জাতিসংঘে গায়ানার রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বিরকেট আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪-২৫ সালে তিনি নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন।
তার নির্বাচনি অঙ্গীকারের মূল বিষয় ছোট দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা, শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। দ্বিতীয় দফার ভোটে তিনি ৮টি ‘উৎসাহিত’, ৩টি ‘নিরুৎসাহিত’ এবং ৪টি ‘মতামত নেই’ ভোট পেয়েছেন। ফলে বর্তমানে তিনিই সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান
রেবেকা গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা UNCTAD-এর মহাসচিব। এর আগে তিনি কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপ-অর্থমন্ত্রী ছিলেন।
২০২২ সালের ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন আলোচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মহাসচিবের কার্যালয় পুনর্গঠন, মধ্যস্থতার সক্ষমতা বাড়ানো, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ওভারলেপিং দায়িত্ব কমানো এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে।
জুলাইয়ের প্রথম ভোটে তিনি ১০টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেলেও আগস্টের দ্বিতীয় ভোটে তা কমে ৭টিতে নেমে আসে।
রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি
রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর মহাপরিচালক। প্রায় চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। গ্রোসি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপাক্ষিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
আগস্টের ভোটে তিনি সাতটি ‘উৎসাহিত’ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। তবে ছয়টি ‘নিরুৎসাহিত’ ভোটও পেয়েছেন।
তার প্রার্থিতা নিয়ে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিরোধ। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য চাইলে তার প্রার্থিতায় ভেটো দিতে পারে।
মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮–১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন ওই পদে দায়িত্ব নেওয়া চতুর্থ নারী এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম নারী।
তার অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ গঠন করা। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
আগস্টের ভোটে তিনি মাত্র ৪টি ‘উৎসাহিত’ ভোট পান। ফলে বর্তমানে তিনি বেশ পিছিয়ে রয়েছেন।
মিশেল ব্যাশেলে
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ আমলাতন্ত্র সংস্কার, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে।
তবে আগস্টের ভোটে তার সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তিনি মাত্র ২টি ‘উৎসাহিত’ এবং ৬টি ‘নিরুৎসাহিত’ ভোট পান।
ম্যাকি সাল
সেনেগালের ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন ম্যাকি সাল। তার নির্বাচনি প্রচারের মূল বক্তব্য হলো ‘নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিকতা’। তিনি জাতিসংঘের সংঘাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা এবং মানবাধিকার ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
তবে তার সামনে বড় বাধা হলো, পরবর্তী মহাসচিব লাতিন আমেরিকা থেকে আসবেন, এমন প্রত্যাশা এবং প্রথম নারী মহাসচিব নির্বাচনের চাপ।
ওলারা ওতুনু
উগান্ডার অভিজ্ঞ কূটনীতিক ওলারা ওতুনু চার দশকের বেশি সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাজ করেছেন। তিনি জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
তিনি দায়িত্বের প্রথম দিন থেকেই ইউক্রেন, গাজা, কঙ্গো, সুদান ও ইরানের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।
জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে তার সমর্থন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তবে লাতিন আমেরিকার নারী প্রার্থী না হওয়ায় তিনিও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকতে পারেন।
ইভোনে এ-বাকি
ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ইভোনে এ-বাকি টোঙ্গার মনোনয়নে এই দৌড়ে যুক্ত হয়েছেন। তার মূল লক্ষ্য সংঘাত প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার। তিনি আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের মতো ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের পক্ষে।
তবে আগস্টের ভোটে তিনি কোনো ‘উৎসাহিত’ ভোট পাননি। তার বিপক্ষে ৮টি ‘নিরুৎসাহিত’ এবং ৭টি ‘মতামত নেই’ ভোট পড়ে। ফলে তার প্রার্থিতা বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।