রবিবার
০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘ফাঁসির আদেশ দিলেই হবে না, কার্যকরও করতে হবে’

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
জুলাই আন্দোলনে নিহত মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাবা আব্দুস সালাম
expand
জুলাই আন্দোলনে নিহত মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাবা আব্দুস সালাম

‘দোষীদের শুধু ফাঁসির আদেশ দিলেই হবে না, সেই ফাঁসি যেন কার্যকর হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই আমার পরিবারসহ দেশের অন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।’

রাজধানীর মিরপুরে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় শুনতে এসে এসব কথা বলেন জুলাই আন্দোলনে নিহত মিরাজুল ইসলাম মিরাজের বাবা আব্দুস সালাম।

আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সরকার এমন আইন করুক, যেখানে কোনো দুর্বলতা বা ফাঁকফোকর থাকবে না। তার আশঙ্কা, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতায় পড়লে তিনি তার ছেলে মিরাজ হত্যার বিচার নাও পেতে পারেন। একইভাবে যাত্রাবাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমি আগেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে বলেছি, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এখনো কেন আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না, কেন মামলাগুলোর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়-এ প্রশ্ন আমার।’

তিনি বলেন, তার ছেলে হত্যার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রমাণ তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তারপরও কেন মামলার চার্জশিট আদালতে দেওয়া হচ্ছে না, সেটি তার বোধগম্য নয়।

‘আমার ভয় হয়, শেষ পর্যন্ত এই মামলাটাও হয়তো বাতিল হয়ে যাবে, কিংবা আমরা বিচার পাব না,’ বলেন তিনি।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার ছেলে মিরাজকে সোশ্যাল মিডিয়ায় খুঁজলেই পাওয়া যাবে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে সে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিল। তখন থানার ভেতর থেকে ছোড়া গুলিতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।’

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম মিরাজ পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, ছোট দুই ভাইয়ের লেখাপড়া এবং পুরো পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতেন তিনি।

মিরাজ মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর জীবিকার তাগিদে ঢাকায় যান। পরবর্তীতে ঢাকার দনিয়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল রশিদবাগ এলাকায় একটি মোবাইল রিচার্জ ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানে কাজ করতেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাবার চিকিৎসার জন্য কয়েক লাখ টাকার ঋণও করেছিলেন মিরাজ ও তার পরিবার। সংসারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন তিনি।

গত বছরের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ি থানার সামনে আন্দোলনে অংশ নেন মিরাজ। তার সঙ্গে ছিলেন খালাতো ভাই মাজেদুল ইসলাম। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজনই আহত হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট মিরাজ মারা যান। তবে তার খালাতো ভাই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ছেলের মৃত্যুর পর একাধিকবার বিচার দাবি করেছেন আব্দুস সালাম। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‌‘ছেলের মৃত্যুর পর আমাদের একেকটা দিন যেন একেকটা বছর।’

তার ভাষায়, আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেটি আর নেই। তার মৃত্যুতে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছে। এখন আমি শুধু আমার সন্তানের বিচার চাই না, এমন বিচার চাই যা অন্য পরিবারগুলোকেও ন্যায়বিচারের আশা দেবে।

তিনি বলেন, ‘যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তবায়নেও দেখতে চাই।’

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন