

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


একই বাড়িতে থাকা মানেই যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক থাকবে, এমন ধারণা সবসময় সত্যি নয়। বর্তমানে অনেক পরিবারেই দেখা যায়, সবাই একই ছাদের নিচে বাস করলেও তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে।
ঘরের প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ কাজ, পড়াশোনা কিংবা মোবাইল স্ক্রিনে এতটাই মগ্ন থাকেন যে, একে অপরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথার বাইরে বাড়তি কোনো আলাপই হয় না।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক বন্ধন শুধু একসঙ্গে বসবাসের ওপর নির্ভর করে না, বরং নিয়মিত আন্তরিক যোগাযোগ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের অনুভূতি বোঝার মানসিকতাই একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।
এসবের অভাব হলে যৌথ পরিবারেও একজন মানুষ তীব্র একাকীত্বে ভুগতে পারেন।
দূরত্ব তৈরির পেছনে কারণসমূহ
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এই মানসিক দূরত্ব একদিনে তৈরি হয় না। এর পেছনে রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ। প্রথমত, যোগাযোগের অভাব- যখন মনের কথা বা সারাদিনের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি না করে কেবল দৈনন্দিন প্রয়োজনেই কথা বলা হয়, তখন সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার সন্ধ্যার আড্ডার জায়গাটি কেড়ে নিয়েছে, ফলে সবাই একই ঘরে থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকেন।
এর পাশাপাশি রয়েছে ব্যস্ত জীবনযাপন, যা মানুষকে এতটাই ক্লান্ত করে দেয় যে পরিবারের জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় কারণ হলো অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা এবং সামান্য বিষয়েই হুট করে বিচারকের আসনে বসে যাওয়া। এর ফলে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়।
এছাড়া, ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না করায় অভিমান জমে পাহাড় সমান হয়। সেই সাথে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত তুলনা ও সমালোচনা মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়।
সবশেষে, কর্মক্ষেত্রের বা আর্থিক অনটনের মানসিক চাপ মানুষকে নিঃসঙ্গ করে তোলে, যা অজান্তেই পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দেয়।
সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার উপায়
পারিবারিক এই দূরত্ব দূর করতে কোনো বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই, দৈনন্দিন কিছু ছোট অভ্যাসই বদলে দিতে পারে পুরো চিত্র। এর জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বা মোবাইল দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের মধ্যে গল্প করার অভ্যাস করতে হবে।
পরিবারের কেউ কিছু বলতে চাইলে তা বিচার না করে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং তাদের ছোট ছোট সাফল্যেও প্রশংসা ও উৎসাহ দিতে হবে।
কোনো বিষয়ে অভিমান হলে তা জমিয়ে না রেখে সময়মতো খোলামেলা কথা বলে সমাধান করা জরুরি। সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া কিংবা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত মতামত এবং তাদের নিজস্ব সীমারেখাকে (প্রাইভেসি) শ্রদ্ধা করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, কেউ কম কথা বলে মানেই সে আবেগহীন নয়, হতে পারে সে তার মতো করে সময় নিচ্ছে। একটি সুন্দর ও সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক যত্ন, সময় ও শ্রদ্ধার ওপর।
তাই পরিবারে যদি কোনো কারণে দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে, তবে সেটিকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বরং ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে, কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটিয়ে এবং আন্তরিকভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সেই হারিয়ে যাওয়া উষ্ণতা আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

