

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স দিয়েই নয়, অন্য ধরণের এক উদযাপনের মাধ্যমেও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নরওয়ে।
সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, আফ্রিকার শক্তিশালী দল সেনেগাল এবং নিজেদের নিয়ে গঠিত ‘গ্রুপ অব ডেথ’ খ্যাত গ্রুপ ‘আই’ থেকে টানা দুই জয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটি।
মাঠজুড়ে ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন
সেনেগালের বিপক্ষে ৩-২ গোলের নাটকীয় জয়ে নরওয়ের হয়ে জোড়া গোল করেন আর্লিং হলান্ড। আর এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পর মাঠজুড়ে দেখা যায় তাদের বহুল আলোচিত ‘ভাইকিং রো’ উদযাপন।
সেনেগালকে হারিয়ে শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করার পর নরওয়ের ফুটবলাররা মাঠের ঘাসে সারিবদ্ধভাবে বসে বা হাঁটু গেড়ে প্রাচীন ভাইকিং লংবোটের আদলে একটি ফরমেশন তৈরি করেন।
এরপর সবাই একসঙ্গে দাঁড় টানার ভঙ্গিতে উদযাপন শুরু করেন। গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থকও একই ছন্দে অংশ নেন, ফলে পুরো স্টেডিয়াম রূপ নেয় এক বিশাল ‘ভাইকিং জাহাজে’।
ওডেগার্ডের নেতৃত্বে অনন্য কোরিওগ্রাফি
উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। হাতে ড্রাম ও ড্রামস্টিক নিয়ে তিনি মাঠের খেলোয়াড় এবং গ্যালারির সমর্থকদের ছন্দ মিলিয়ে পরিচালনা করেন পুরো কোরিওগ্রাফি।
তার ড্রামের তালে তালে সমর্থকদের অংশগ্রহণ স্টেডিয়ামজুড়ে এক অনন্য আমেজ সৃষ্টি করে।
জাতীয় গর্বের প্রতীকে পরিণত ‘ভাইকিং রো’
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের সময় থেকেই ‘ভাইকিং রো’ নরওয়েজিয়ান সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। তবে মূল পর্বে দলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এটি এখন জাতীয় গর্ব, ঐক্য এবং পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আয়োজক শহরগুলোতে হাজার হাজার নরওয়েজিয়ান সমর্থক একত্রিত হয়ে এই উদযাপনে অংশ নিচ্ছেন। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে শত শত ভক্তের সম্মিলিত ‘রো’ সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। শুধু তাই নয়, বোস্টনের ট্রানজিট এসকেলেটর কিংবা নরওয়ের পার্লামেন্ট ভবনেও এই উদযাপনের প্রতিফলন দেখা গেছে।
‘ভাইকিং রো’-এর উৎপত্তি
তবে ‘ভাইকিং রো’-এর শিকড় ফুটবলে নয়। এর উৎপত্তি রক ও হেভি মেটাল সংগীতের জগতে। সেখানে এটি ‘রোয়িং পিট’ নামে পরিচিত। সুইডেনের জনপ্রিয় ব্যান্ড আমন আমার্থ এবং সুইজারল্যান্ডের এলিভেইতির মতো ফোক ও ভাইকিং মেটাল ব্যান্ডের কনসার্টে দর্শকদের এভাবে বসে দাঁড় টানার ভঙ্গি করতে দেখা যায়। ভাইকিং সংস্কৃতি ও নর্স পুরাণভিত্তিক গানের সঙ্গে এই কোরিওগ্রাফি ধীরে ধীরে মেটাল সংস্কৃতির অন্যতম পরিচিত অংশে পরিণত হয়।
ভাইকিং মেটাল ধারার বিকাশ এবং এর সাংস্কৃতিক বিস্তার
‘ভাইকিং রো’ ধারার ভিত্তি গড়ে দেন সুইডিশ ব্যান্ড বাথোরির প্রতিষ্ঠাতা থমাস ‘কোয়ার্টন’ ফোরসবার্গ। আশির দশকে তিনি ভাইকিং ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে যে সংগীতধারার সূচনা করেন, সেটিই পরবর্তীতে ‘ভাইকিং মেটাল’ নামে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘রোয়িং পিট’ মেটাল সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে পপ সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নেয়। এমনকি মার্কিন পপ তারকা হ্যালসির কনসার্টেও দর্শকদের একই ধরনের কোরিওগ্রাফিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
নরওয়েতে কেন ‘ভাইকিং রো’এতো জনপ্রিয়
নরওয়ের ক্ষেত্রে এই উদযাপন শুধু বিনোদনের অংশ নয়, বরং তাদের সমৃদ্ধ সামুদ্রিক ইতিহাসেরও প্রতীক। অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভাইকিংরা সমুদ্রপথে দূরপাল্লার অভিযান, বাণিজ্য এবং যুদ্ধের জন্য বিখ্যাত ছিল। যুদ্ধের আগে বা তীরে পৌঁছানোর মুহূর্তে তারা ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘ জাহাজে একযোগে দাঁড় টানত।
আধুনিক ‘ভাইকিং রো’ সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যেরই প্রতীকী পুনর্নির্মাণ, যেখানে হাজারো মানুষ একসঙ্গে একই ছন্দে অংশ নিয়ে ঐক্য ও শক্তির বার্তা তুলে ধরে।
বিশ্বকাপের নতুন ফ্যান-কালচার আইকন
২০১৬ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে আইসল্যান্ডের ‘ভাইকিং থান্ডার ক্ল্যাপস’ যেমন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, তেমনি এবারের বিশ্বকাপে নরওয়ের ‘ভাইকিং রো’ও দ্রুতই টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত ফ্যান-কালচার মুহূর্তে পরিণত হয়েছে।
মাঠের সাফল্য, ইতিহাসের গর্ব এবং আধুনিক সংস্কৃতির মিশেলে এই উদযাপন এখন নরওয়ের বিশ্বকাপ অভিযানের অন্যতম পরিচয় হয়ে উঠেছে।
