সোমবার
২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩ মাঘ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জ-৪ আসনে ফয়সল-তাহেরী–আহমদ আব্দুল কাদেরের ত্রিমুখী লড়াই

ত্রিপুরারী দেবনাথ তিপু, মাধবপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
ফয়সল-তাহেরী–আহমদ আব্দুল
expand
ফয়সল-তাহেরী–আহমদ আব্দুল

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর–চুনারুঘাট) আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ। পাঁচ লক্ষাধিক ভোটারের এই আসনে এবার লড়াই আর একমুখী নয়, বরং স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রকাশ্য মাঠের রাজনীতি, নীরব ভোট ব্যাংক আর অপ্রকাশিত সমর্থনের হিসাব মিলিয়ে এই আসন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশেষ নজরে।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম ফয়সল রাজনীতির মাঠে পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, সংগঠনের ওপর দখল এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অবস্থান তাকে শুরু থেকেই এগিয়ে রেখেছে। চা শ্রমিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তার ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সহানুভূতিশীল ভূমিকা নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বাস্তব ভোট ব্যাংকে রূপ নিয়েছে।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে ফয়সলের নেতৃত্বে দলটি মাঠে তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ। মামলা ও হয়রানিমুক্ত রাজনীতির প্রতিশ্রুতি এবং সরাসরি ভোটার সংযোগের কৌশল তাকে ‘প্রথাগত প্রার্থী’ থেকে আলাদা করছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের রাজনৈতিক ভারই তার প্রধান শক্তি আবার সেটিই কিছু ভোটারের কাছে দুর্বলতা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

এই সমীকরণে সবচেয়ে আলোচিত নাম গিয়াস উদ্দিন আত তাহেরী। ইসলামী বক্তা হিসেবে পরিচিত এই প্রার্থী অল্প সময়েই নির্বাচনী মাঠে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। তার সমাবেশগুলোতে তরুণদের উপস্থিতি এবং বক্তব্যে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন উঠে আসায় এক ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা ছড়াচ্ছে।

তাহেরীর শক্তি মূলত দৃশ্যমানের চেয়ে অদৃশ্য। সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি অংশ, চা বাগান অধ্যুষিত অঞ্চল এবং ধর্মীয় আবেগপ্রবণ ভোটারদের নীরব সমর্থন তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকিয়ে রেখেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ধারণা রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট এবং প্রবাসী রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের কিছু সমর্থন তার দিকে ঝুঁকতে পারে।

বিশেষ করে চুনারুঘাট উপজেলায় তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। জনমনের ভাষা বুঝে বক্তব্য সাজানো এবং বিতর্কিত ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

ত্রিমুখী এই লড়াইয়ের তৃতীয় মাত্রা ১০ দলের জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আহমদ আব্দুল কাদের। প্রচারের দিক থেকে তিনি অনেকটাই নীরব, তবে রাজনীতিতে নীরবতা যে সব সময় দুর্বলতা নয়, তা অতীতের বহু নির্বাচনে দেখা গেছে।

সংগঠিত ধর্মভিত্তিক ভোট, স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং জোট রাজনীতির সমর্থন এই তিন উপাদান তাকে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে হাজির করতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে তার প্রাপ্ত ভোট অন্য দুই প্রার্থীর ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত কার দিকে যাবে পাল্লা।

এই আসনে ভোটের ফল নির্ধারিত হবে শেষ মুহূর্তের জনসেন্টিমেন্ট, নীরব ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং ভোটকেন্দ্রভিত্তিক উপস্থিতির ওপর। একদিকে অভিজ্ঞতা ও সংগঠনের জোর, অন্যদিকে ধর্মীয় আবেগ ও নীরব সমর্থন এই দুই শক্তির সংঘাতে ফলাফল যে অনিশ্চিত, তা বলাই বাহুল্য।

সব মিলিয়ে, হবিগঞ্জ-৪ আসনের নির্বাচন এবার কেবল একজন বিজয়ীর গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রবণতার, নীরব ভোটের এবং নতুন সমীকরণের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। ফল যাই হোক, এই আসনের রায় ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যাবে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X