

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। প্রচার–প্রচারণায় সরগরম সারাদেশ। এদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোটার অংশ নিতে যাচ্ছেন জাতীয় নির্বাচনে।
সম্প্রতি ইসি আসনভিত্তিক হালনাগাদ ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে জানা গেছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
ভোটারদের মধ্যে পুরুষ রয়েছেন ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং হিজড়া ভোটার আছেন ১ হাজার ১২০ জন।
এছাড়া, এই নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে প্রবাসী ভোটাধিকার। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এই পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে সাত লাখ ৭২ হাজার ভোটার আগামী নির্বাচনে পোস্টাল ভোট দিতে নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর তাদের কাছে ব্যালটও পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন যে আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার গাজীপুরে এবং সবচেয়ে কম ভোটার ঝালকাঠিতে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকার পাশাপাশি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকাও ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এতে দেখা গেছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়বেন এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আর সবচেয়ে কম প্রার্থী রয়েছে পিরোজপুর-১ আসনে।
যদিও প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর কেউ কেউ তা ফিরে পেতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন উচ্চ আদালতে। আদালতের রায়ে প্রার্থিতা ফেরত আসলে এবারের প্রার্থী সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে আসন ভিত্তিক ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটার সংখ্যা পৌনে ১৩ কোটিতে পৌঁছেছে।
সারাদেশের ভোটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা ও গাজীপুরেই ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
সারাদেশের আসনভিত্তিক ভোটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, সারাদেশে ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটার গাজীপুর-২ আসনে।
এই আসনে মোট ভোটার রয়েছে আট লাখ চার হাজার ৩৩৩ জন। এরমধ্যে চার লাখ ৪০২জন পুরুষ এবং চার লাখ তিন হাজার ৯১৮জন ভোটার নারী। আর হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৩ জন।
এর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটার রয়েছে, সাভার-আশুলিয়া অঞ্চল নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৯ আসনে। এই আসনের ভোটার সংখ্যা সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০জন। এই আসনে নারী ভোটারের চেয়ে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা বেশি।
ঢাকা ১৯ আসনে তিন লাখ ৭৯ হাজার ৯০৬ জন পুরুষ ভোটারের বিপরীতে নারী ভোটার রয়েছেন তিন লাখ ৬৭ হাজার। এই আসনেও হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৩ জন।
তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোটার গাজীপুর-১ আসনে, সাত লাখ ২০ হাজার ৯৩৯ জন ভোটার। এর মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার ২৩৪ জন পুরুষ, তিন লাখ ৬০ হাজার ৬৯৩জন নারী এবং ১২ জন রয়েছেন হিজড়া ভোটার।
গাজীপুরের দুইটি আসন বাদেও সাত লাখের বেশি ভোটার রয়েছে নোয়াখালী-৪ আসন। আর ছয় লাখের বেশি ভোটার আছে সাতটি আসনে। সেগুলো হলো- ময়মনসিংহ-৪, সিলেট-১, কুমিল্লা-৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, ঢাকা-১৮, যশোর-৩ ও কুড়িগ্রাম-২ আসন।
পাঁচ লাখের বেশি ভোটার রয়েছে, এমন আসনের সংখ্যা ৫২টি। চার লাখের বেশির ভোটার রয়েছে, এমন আসন সংখ্যা ১১৩টি, আর তিন লাখের বেশি ভোটার আছে, এমন আসনের সংখ্যা ১০৪টি।
ঢাকা-গাজীপুর অঞ্চলে ভোটার সংখ্যা বেশি হলেও এর বিপরীতে কম ভোটার দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠিতে।
নির্বাচন কমিশন সরবারহকৃত ভোটার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝালকাঠি-১ আসনে ভোটার রয়েছেন দুই লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন।
কম ভোটারের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যশোর-৬ আসন। এই আসনে পুরুষ ভোটার এক লাখ ১৫ হাজার, নারী ভোটার এক লাখ ১৩ হাজার আর হিজড়া ভোটার দুইজন।
ভোটার সংখ্যা কমের দিক থেকে পিরোজপুর-৩ আসনের অবস্থান তিন নম্বরে। এই আসনে ভোটার আছেন দুই লাখ ৪১ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ২২ হাজার, নারী ভোটার এক লাখ ১৯ হাজার এবং হিজড়া ভোটার একজন।
বিভাগীয় শহর খুলনা-৩ আসনেও ভোটার সংখ্যা তুলনামূলক কম। এই আসনে মোট ভোটার দুই লাখ ৫৪ হাজার। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ২৭ হাজার, নারী ভোটার এক লাখ ২৬ হাজার, আর হিজড়া ভোটার আটজন।
পঞ্চম অবস্থানে চট্টগ্রাম-৩ আসন। এই আসনে মোট দুই লাখ ৬০ হাজার ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৩৪ হাজার, নারী ভোটার এক লাখ ২৫ হাজার আর হিজড়া ভোটার দুই জন।
তিন লাখের নিচে ভোটার আছে ঢাকার সবচেয়ে আলোচিত আসন ঢাকা-৮ আসনে। এই আসনে মোট দুই লাখ ৭৫ হাজার ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫২ হাজার, নারী ভোটার এক লাখ ২২ হাজার এবং হিজড়া ভোটার আছেন একজন।
এছাড়াও মেহেরপুর-২, বাগেরহাট-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১, লক্ষ্মীপুর-১ আসনেও কম ভোটার সংখ্যা তালিকায় রয়েছে। এই আসনগুলোতেও ভোটার সংখ্যা তিন লাখের নিচে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি আসনের ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী ব্যালট পেপার মুদ্রণ এবং ভোটকেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। যেহেতু ভোটারদের এবার দুটি ভিন্ন বিষয়ে ভোট দিতে হবে, তাই ভোট গ্রহণ ও গণনায় বাড়তি সতর্কতা এবং অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, এবারের নির্বাচনে আড়াই হাজারের বেশি প্রার্থী প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিল।
যাচাই বাছাই ও ইসির আপিল নিষ্পত্তি শেষে গত মঙ্গলবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রার্থী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন, নারী প্রার্থী ৭৬ জন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ২৮৮ জন।
নিবন্ধিত নয়টি রাজনৈতিক দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের একাংশ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম।
প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে জানিয়েছে- এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী তেজগাঁও- ফার্মগেট এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১২ আসনে। আর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী পিরোজপুর-১ আসনে।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনেই দেশের সব আসনের মধ্যে বেশি প্রার্থী, সেখানে লড়ছেন ১৫ জন।
আর সবচেয়ে কম পিরোজপুর-১ আসনে প্রার্থী রয়েছেন মাত্র দুইজন। তাদের একজন বিএনপির এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর।
রিটার্নিং কর্মকর্তার যাচাই বাছাই ও ইসির আপিলে অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তাদের কোনো কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন আবার উচ্চ আদালতের আপিলেও ফেরত আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেলে এই প্রার্থী সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন