


সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনন গঠনে কওমী মাদরাসার ভূমিকা অনস্বীকার্য। যুগ যুগ ধরে এই শিক্ষাব্যবস্থা এদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ধর্মীয় শিক্ষার আলো ও নৈতিক মূল্যবোধের চেতনা ছড়িয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এবং গর্হিত কর্মকাণ্ড জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন নন্দিত আলেমে দ্বীন ও ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তিনি বলেন, অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আপনাদের সমীপে এই আরজ পেশ করছি। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে কওমী মাদরাসা নেতিবাচকভাবে সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। একজন কওমী মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ও ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সন্ধ্যায় উলামায়ে কেলাম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক একাউন্টে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাজে কওমি মাদরাসার অবদান তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন,বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কওমী মাদরাসা কেবল কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং এটি এদেশের অবহেলিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্যতম সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান বা বাজেট ছাড়াই সম্পূর্ণ জনগণের অর্থায়নে এই মাদরাসাগুলো পরিচালিত হচ্ছে। লাখ লাখ এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশু-কিশোর-যুবকের অন্ন, বস্ত্র, আবাসন ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে এই মাদরাসাগুলো। এর ফলে একদিকে রাষ্ট্র এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোঝা থেকে মুক্ত হচ্ছে।
এরপর পোস্টে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তবে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার গৌরবোজ্জ্বল অবদানের পাশাপাশি কিছু অপ্রিয় ও নির্মম সত্যও আমাদের স্বীকার করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের প্রতি শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের খবর আমাদের সামনে আসছে। অথচ, ইসলামী শরীয়ায় শিশুদের সাথে কোমল আচরণের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। অননুমোদিত যৌনাচার এবং সমকামিতাকে ইসলামে কবীরা গুনাহ ও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তদুপরি কতিপয় তথাকথিত শিক্ষক কর্তৃক এহেন ইসলাম ও নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া যুগপৎ উদ্বেগজনক এবং লজ্জাজনক।
এই সংকটের অপর পিঠে রয়েছে এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও একপেশে অপপ্রচার মন্তব্য করে শায়খ বলেন, এদেশের মূলধারার এক শ্রেণির গণমাধ্যম ও নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের প্রধান লক্ষ্য এখন মাদরাসার নানা নেতিবাচক ঘটনা। সচরাচর আলেমদের দ্বারা অপরাধের হার সমাজের অন্যান্য স্তরের তুলনায় অত্যন্ত কম হওয়া সত্ত্বেও, কোনো ইসলামী লেবাসধারী ব্যক্তির নেতিবাচক খবর পেলেই তারা সত্যের সাথে মিথ্যার রঙ মাখিয়ে তা বিশাল আকারে প্রচার করে। ব্যক্তিবিশেষের অপরাধকে গোষ্ঠীবিশেষের ঘাড়ে চাপানোর অপচেষ্টাও দেখা যায়। বিপরীতে মাদরাসা সংক্রান্ত ইতিবাচক সংবাদ প্রচারে তাদের এতোটা আগ্রহী দেখা যায় না।
`তবে এটি স্বীকার্য যে, সব সংবাদই মিথ্যা নয়। সুতরাং, মিডিয়ার অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান বাস্তব সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুদের শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধগুলোর বেলায় অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি না দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।‘
দ্বীনের এই অপরাজেয় দুর্গগুলোকে সুরক্ষার স্বার্থে নেতৃত্বস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের সমীপে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা পেশ করছি বলে শায়খ ৬ টি প্রস্তাব দেন।
১. কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন
আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শীর্ষ আলেম, আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা সময়ের দাবি। কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠা মাত্রই এই কমিটি দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হলে, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করার জন্য সুপারিশ করবে। পাশাপাশি তার নাম-পরিচয় দিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ (কালো তালিকা) তৈরি করতে হবে, যাতে সে আর কখনো দেশের কোনো মাদরাসায় চাকরি না পায়। আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংবাদ সম্মেলন করে তা দৃঢ়তার সাথে জাতির সামনে তুলে ধরবে। এর মাধ্যমে অপরাধী শাস্তি পাবে, আর নিরপরাধ ব্যক্তি মিথ্যা অভিযোগের বোঝা থেকে মুক্ত হবে। সামগ্রিকভাবে এই কাজটি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
২. অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠন
কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ অথোরিটি আল-হাইয়াতুল উলইয়া কর্তৃক একটি সেল গঠন করা যেতে পারে। তাদের কাছে ভিক্টিমরা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবে। সে ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় ও তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে হবে। এই সেল ভিক্টিমের পরিবারকে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদান করবে এবং কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির কাছে প্রতিবেদন পেশ করবে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে সুপারিশ করবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার
(ক) সিসি ক্যামেরা ও সার্বিক মনিটরিং: মাদরাসার ক্লাসরুম, বারান্দা এবং বিশেষ করে নূরানী, হিফয ও আবাসিক বিভাগগুলোকে সম্পূর্ণ সিসি টিভির আওতায় এনে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
(খ) নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত আবাসিক থাকা নিরুৎসাহিত করা: কম বয়সী শিশুদের অনাবাসিক হিসেবে শিক্ষাদানের চেষ্টা করতে হবে। অতি অল্প বয়সে মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আবাসনে থাকার ফলে শিশুরা মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে, যা তাদের নানা রকম নিপীড়নের ঝুঁকিতে ফেলে। তাই একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুদের নিজ পরিবারের তত্ত্বাবধানে রেখে মাদরাসায় যাতায়াতের মাধ্যমে পাঠদানে উৎসাহিত করতে হবে। তবে যেসব এতিম এবং পথশিশুদের থাকার মতো ব্যবস্থা নেই, তাদের জন্য প্রতিষ্ঠান বিকল্প বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে পারে।
(গ) আবাসন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা: আবাসিক মাদরাসায় প্রচলিত ঢালাও বিছানা বা গণরুমের পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিছানাগুলো একেবারে গায়ে গায়ে না রেখে দুই বিছানার মধ্যে ন্যূনতম এক হাত পরিমাণ ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর যেসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা ধীরে ধীরে পৃথক খাট বা কমপক্ষে স্বল্প খরচে চৌকির ব্যবস্থা করতে হবে।
(ঘ) শিক্ষার্থীদের সেবা গ্রহণ না করা: শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের থেকে কোনোরূপ শারীরিক সেবা নিতে পারবেন না। এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। এটি লঙ্ঘন করলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪. শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন
(ক) আচরণ সম্পর্কিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শিক্ষার্থীদের সাথে আচরণ সম্পর্কিত একটি সুনির্দিষ্ট ও কঠোর ‘আচার-আচরণ নীতিমালা’ প্রণয়ন এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
(খ) শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা: শিক্ষকদের জন্য পেশাগত ও আচরণগত নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে শিশু মনস্তত্ত্ব, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে ইসলাম সমর্থিত স্নেহপূর্ণ আচরণ এবং শিশু সুরক্ষা আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে তাদের সচেতন ও সংবেদনশীল করে তুলতে হবে, যেন তারা প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সাথে শিক্ষাদান করতে পারেন।
(গ) বৈবাহিক অবস্থা: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষাগত ও নৈতিক যোগ্যতার পাশাপাশি বিবাহিত হওয়া এবং পরিপক্ব বয়সের শর্তারোপ করা উচিত। বিশেষ করে নূরানী, হিফয এবং প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানে অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অপরিণত তরুণদের দায়িত্ব না দিয়ে অভিজ্ঞ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
(ঘ) পারিবারিক সান্নিধ্য ও ছুটি: শিক্ষকদের জন্য মাদরাসার ব্যবস্থাপানায় সপরিবারে থাকার (ফ্যামিলি কোয়ার্টার) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা এবং নিয়মিত যৌক্তিক ছুটির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যাতে তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক জীবন স্বাভাবিক থাকে।
৫. নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতি
(ক) বালিকা বা মহিলা মাদরাসায় অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামো সম্পূর্ণ নারী কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ নিয়োগ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে (কেবল প্রধান ফটকে প্রহরী এবং বাহিরের কাজগুলো তদারকির জন্য বয়স্ক পুরুষ রাখা যেতে পারে)। অভিভাবক বা বহিরাগতদের সাথে সমস্ত যোগাযোগ ও লেনদেন নারী স্টাফদের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
(খ) বালিকা মাদরাসা যথাসম্ভব অনাবাসিক রাখার চেষ্টা করতে হবে। আবাসিক মাদরাসার ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং কোনো ক্রমেই পুরুষ শিক্ষক বা স্টাফ (প্রহরী ছাড়া) রাখা যাবে না।
৬. অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মতন্ত্রের মধ্যে আনা
(ক) বর্তমানে দেশের আনাচে-কানাচে অপরিকল্পিতভাবে কিছু মানহীন প্রাইভেট মাদরাসা গড়ে উঠছে, যা সামগ্রিকভাবে মাদরাসা শিক্ষার মান ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। তবে এই সংকট জেনারেল শিক্ষা ব্যবস্থাতেও আছে। যত্রতত্র মানহীন কিন্ডার গার্টেন টাইপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। তাই সব ধরণের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত তদারকির ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। এর মাধ্যমে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আরও সুসংগঠিত, কার্যকর ও মানসম্মত হবে বলে আশা করা যায়।
শায়খ আহমাদুল্লাহ লেখেন, উল্লিখিত সবগুলো প্রস্তাব হাইয়াতুল উলইয়া এবং বেফাকুল মাদারিসসহ জাতীয় বোর্ডগুলোর সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তবে এই দুটি অভিভাবক প্রতিষ্ঠান যদি ব্যাপকভাবে সচতেনতা সৃষ্টি এবং সাধারণ নির্দেশনা জারি করে; পাশাপাশি নিবন্ধনের জন্য এই শর্তগুলো আরোপ করে এবং কঠোরভাবে মনিটরিং করে, তাহলে সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমে আসবে বলে আমরা মনে করি।
পোস্টের শেষে তিনি আল্লাহর তাওফিক কামনা করে, উলামায়ে কেরাম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে উল্লেখিত প্রস্তাবনাগুলো বিবেচনায় নেওয়া আহ্বান জানান।