


জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইইআর) এখন তীব্র সেশনজটের এক চরম নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ যখন করোনা ও পরবর্তী সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে জট নিরসনে দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা শেষ করছে, তখন আইইআর-এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, পরীক্ষার রুটিন প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা, খাতা মূল্যায়নে উদাসীনতা এবং ফলাফল প্রকাশে ৬-৭ মাসের বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর যেখানে আধুনিক শিক্ষা কারিকুলাম ও নিয়মতান্ত্রিকতায় এগিয়ে, সেখানে জবির এই ইনস্টিটিউটটি যেন অভিভাবকহীন ও স্থবির এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইনস্টিটিউটের ১৬ থেকে ২০ প্রতিটি ব্যাচই বর্তমানে তীব্র সেশনজটের কবলে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যেখানে মাস্টার্স শেষের পর্যায়ে, সেখানে আইইআর-এর এই ব্যাচটির এখনো অনার্স চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ হয়নি। মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার রুটিন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে শত শত শিক্ষার্থীর।
একইভাবে ১৭ ব্যাচের অনার্স তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের মিডটার্ম গত ১ এপ্রিল শেষ হলেও মে মাস পেরিয়ে গেলেও পরীক্ষার চূড়ান্ত রুটিন প্রকাশ করা হয়নি। ১৮ ব্যাচের পূর্ববর্তী সেমিস্টারের ফলাফল এখনো ঝুলে আছে এবং তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের মিডটার্ম শেষ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ১৯ ব্যাচের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের ক্লাস ও মিডটার্ম শেষ হলেও দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হচ্ছে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। সাধারণ নিয়মে একটি সেমিস্টার ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, আইইআর-এ মাত্র ৪-৫ মাসের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শেষ করতে ৮-৯ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পুরো ইনস্টিটিউটে স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৫ জন। এই চরম শিক্ষক সংকট নিরসনে শুরু থেকেই গেস্ট টিচার বা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। সম্প্রতি নতুন পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পরও অবস্থার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর ওপর আরেকটি বড় দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফলাফল প্রকাশ। এক সেমিস্টার শেষ হওয়ার অর্ধেকের বেশি বছর পেরিয়ে গেলেও রেজাল্ট পাওয়া যায় না। এমনকি দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ হওয়ার আগের দিন প্রথম সেমিস্টারের রেজাল্ট দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনাও এখানে ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তারা বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং দ্রুত পড়ালেখা শেষ করে পরিবারের হাল ধরা তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ৪ বছরের কোর্স যদি ৬ বছরেও শেষ না হয়, তবে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। অথচ এসব অ্যাকাডেমিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে শিক্ষকদের ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্ট ও ভাইভায় রোষানলে পড়ার ভয় থাকে বলেও তারা উল্লেখ করেন। বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষার্থীরা দ্রুত পর্যাপ্ত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যোগ্য গেস্ট টিচার দিয়ে ক্লাস সচল রাখা, পরীক্ষা শেষের ১ মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়মানুযায়ী ৪ থেকে ৫ মাসের মধ্যে সেমিস্টার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন।
সার্বিক অচলাবস্থা ও কাঠামোর ভিত্তিতে আইইআরের পরিচালক অধ্যাপক ড . মো: আজম খান বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষক সংকটই মূল সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এ যেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষক আছেন, সেখানে আমাদের এখানে শিক্ষক মাত্র ৫ জন। এই অল্প কয়েকজন শিক্ষক নিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স মিলিয়ে ৫টি ব্যাচের প্রায় ২৫ থেকে ২৭টি কোর্সের ক্লাস কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধানও করা যাচ্ছে না, কারণ ইউজিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের জটিলতার কারণে নতুন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। সংকট কাটাতে বাইরে থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক আনার চেষ্টা করা হলেও, দূরত্বের কারণে তারা নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না। এর ফলে বর্তমান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং একেকজনকে ৪ থেকে ৫টি করে কোর্স পড়াতে হচ্ছে, যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়েও বেশি ধকলের। এতে করে শিক্ষকদের পক্ষে গবেষণামূলক কাজ বা ক্লাসের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকছে না। শিক্ষকদের এই চাপ কিছুটা কমাতে তিনি নিজে অন্য ডিপার্টমেন্টের হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার ডিউটি ও মিটিংয়ের মতো প্রশাসনিক দায়িত্বগুলো সামলে নিচ্ছেন বলে জানান। তিনি মনে করেন, দ্রুত নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলে এখানকার ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. রইচ উদ্দিন বলেন, আইইআর-এর শিক্ষক সংকট ও সেশনজটের বিষয়টি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুরোপুরি অবগত রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম এভাবে স্থবির হয়ে থাকা এবং শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে সময় নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইউজিসির সাথে যোগাযোগ করে নতুন শিক্ষকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সেশনজট কমিয়ে আনতে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুত খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশেষ একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সেশনজট মুক্ত ও সুন্দর শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।