


নদীবিধৌত ও শিল্পসমৃদ্ধ জনপদ খুলনা-৪ আসনকে (রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া) একটি ‘সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও আধুনিক’ মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল।
তিনি ভৈরব নদের ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ, ঐতিহ্যের স্টার জুট মিল চালু, দুগ্ধ শিল্পে বিপ্লব ঘটানো এবং সন্ত্রাসমুক্ত জনপদ গড়ার অঙ্গীকার করেছেন।
আজ শনিবার সকাল ১১টায় খুলনার আইচগাতিতে তার প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ইশতেহার পাঠ করেন তিনি।
এ সময় তিনি বিগত ১৭ বছরে এলাকার উন্নয়ন বঞ্চনা, ভোটাধিকার হরণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে পরিবর্তনের ডাক দেন।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের অঙ্গীকার :ইশতেহারে ভৌত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন আজিজুল বারী হেলাল। তিনি বলেন, রূপসা ও ভৈরব নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই জনপদকে মূল শহরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, ভৈরব নদীর ওপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ করে খুলনা শহরের সঙ্গে রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। এছাড়া অসমাপ্ত নগরঘাট ও রেলিগেট সেতু নির্মাণ কাজ দ্রুত সম্পাদন করা হবে।
ফেরিঘাট কেন্দ্রিক জনদুর্ভোগ লাঘবে তিনি অভিনব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, রূপসা, সেনেরবাজার ও পথেরবাজার খেয়াঘাটগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে। শষ্য এলাকার গ্রামের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যদি ইজারার টাকাটা শোধ করে, তবে আমাদের এই অঞ্চলগুলো টোলমুক্ত ফেরিঘাট হবে। মানুষ নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
এছাড়া ফেরিঘাট সংলগ্ন যানজট নিরসনে রাস্তাগুলোকে ‘ফোর-লেন’ এ উন্নীত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ‘রাউন্ড এবাউট’ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
শিল্প ও বাণিজ্যে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার:খুলনার মৃতপ্রায় পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, একসময়ের ব্যস্ততম স্টার জুট মিল পুনরায় চালু করা হবে। এছাড়া পরিত্যক্ত পাটের গুদামগুলোকে কাজে লাগিয়ে সেখানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপন করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
বাজার ব্যবস্থাপনায় আধুনিকতার ছোঁয়া আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “সেনেরবাজার, রূপসা বাজার ও দিঘলিয়া বাজারকে আধুনিক শপিং মলের আদলে গড়ে তোলা হবে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমবে, অন্যদিকে আধুনিক বিপণি বিতানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
কৃষি ও ডেইরি শিল্পে নতুন সম্ভাবনা : তেরখাদা ও রূপসা অঞ্চলের প্রচুর গরুর খামার থাকলেও খামারিরা দুধের ন্যায্যমূল্য পান না। এ সংকট নিরসনে হেলাল একটি ‘মডেল ডেইরি প্ল্যান্ট’ স্থাপনের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, মিল্ক ভিটা বা আড়ংয়ের আদলে আমরা একটি প্রসেসিং প্ল্যান্ট নির্মাণ করব। প্রয়োজনে ‘রূপসা’ বা ‘তেরখাদা’ ব্র্যান্ড নামে আমরা প্যাকেটজাত দুধ বাজারে ছাড়ব, যেন খামারিরা তাদের কষ্টের সঠিক মূল্য পান।
এছাড়া কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে সার-বীজ প্রদান এবং পচনশীল সবজি (পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচামরিচ) সংরক্ষণে এলাকায় একটি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতা। তিনি স্পষ্ট করেন, নির্বাচিত হলে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক আশ্রয় পাবে না।
দৃপ্ত কণ্ঠে তিনি বলেন,গত ১৭ বছরে এই জনপদে মাদক ও সন্ত্রাসের যে অভয়ারণ্য তৈরি হয়েছে, তা আমরা সমূলে উৎপাটন করব। আমি প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তারা শুধুই অপরাধী। তাদের গ্রেপ্তার করুন। কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে তাদের আশ্রয় হবে না।
এছাড়া তেরখাদার দুর্গম গ্রামগুলোতে দ্রুত পুলিশি সেবা পৌঁছে দিতে নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গন
খুলনা-৪ আসনের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন হেলাল। তিনি বলেন, এই অঞ্চল বক্সিং ও অ্যাথলেটিক্সে এক সময় দেশসেরা ছিল।
সেই গৌরব ফেরাতে দিঘলিয়ার হাজী গ্রামে মিনি স্টেডিয়ামকে আধুনিকায়ন এবং খেলোয়াড়দের জন্য একটি ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ গড়ে তোলা হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে দিঘলিয়ার ‘আলহাজ্ব সরোয়ার খান ডিগ্রি কলেজ’ সরকারিকরণ এবং কবি কৃষ্ণচন্দ্র ইনস্টিটিউট ও তার জন্মভিটা সংরক্ষণ করে লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি, যা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে তিনি ১০০ দিনের একটি বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার ১০০ দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য শহরে ছুটতে না হয়।
সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় এই তিন উপজেলার ৫০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দেন তিনি।
পরিবেশ ও জলাবদ্ধতা নিরসন
লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির আদলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্পের আওতায় এলাকার মৃতপ্রায় খালগুলো উদ্ধার করা হবে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন এবং নদী ভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণের অঙ্গীকার করেন তিনি।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য খান রবিউল ইসলাম রবি, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মোল্লা খায়রুল ইসলাম, জিএম কামরুজ্জামান টুকু, অধ্যাপক মনিরুল হক বাবুল, শেখ আব্দুর রশিদ, আব্দুস সালাম, আছাফুর রহমান ও আশরাফুল ইসলাম নুর।
এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক আতাউর রহমান রনু, গোলাম মোস্তফা তুহিন, রূপসা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক মোল্লা সাইফুর রহমান, তেরখাদা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক চৌধুরী কাওছার আলী, আবু সাঈদ, সেতারা সুলতানা, গোলাম ফারুক, শেখ আবু সাঈদ, ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, শরিফ নাইমুল ইসলাম, আবুল কাশেম, রেজাউল ইসলাম রেজা, মো: রয়েল, খালেদা পারভিন সিনথিয়া ও শিহাবুল ইসলাম সিহাব প্রমুখ।
মন্তব্য করুন