শুক্রবার
১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিডনি রোগে বিপর্যস্ত ভিকারুননিসার শিক্ষক আনোয়ার

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
মো. আলী আনোয়ার
expand
মো. আলী আনোয়ার

শৈশব থেকেই সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন মো. আলী আনোয়ার। মাত্র চার বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে বাবার বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল তাকে। অভাবের সংসারে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন। কখনো কৃষিশ্রমিক, কখনো টিউশনি করে নিজের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন আনোয়ার। মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়।

কিন্তু জীবনের প্রতিটি ধাপে সংগ্রাম করা এই মানুষটির সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়া আলী আনোয়ারের দুটি কিডনিই এখন অকার্যকর। বেঁচে থাকতে হলে নিয়মিত ডায়ালাইসিসের পাশাপাশি দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। কিন্তু চিকিৎসার বিপুল ব্যয় বহন করার সামর্থ্য তার নেই।

আলী আনোয়ার বর্তমানে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আজিমপুর শাখায় ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

শৈশবেই শুরু সংগ্রাম

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার মাঝগ্রাম ইউনিয়নের আগরান গ্রামের মৃত মসলেম উদ্দিন ভূইয়ার ছেলে আলী আনোয়ার। তার বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এর দুই বছর পর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে চার বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে বাবার বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে। আশ্রয় নেন পাশের উপজেলা গুরুদাসপুরের চন্দ্রপুর গ্রামে নানাবাড়িতে।

নানাবাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে তার মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ তো দূরের কথা, জীবনের দীর্ঘ সময়েও বাবার তেমন খোঁজ পাননি আনোয়ার। বাবার মৃত্যুর আগেই সৎ ভাইয়েরা পৈতৃক সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নেয়ায় উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত হন তিনি।

অভাবের মধ্যেও পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তার মেধা ও অসহায়ত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় শিক্ষকরা স্কুলের মাসিক বেতন ও পরীক্ষার ফি মওকুফ করে সহযোগিতা করেছেন। এমনকি এসএসসি পরীক্ষার আগে এক বছর প্রধান শিক্ষক তাকে নিজ বাড়িতে রেখে পড়িয়েছেন। কৈশোরে অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন তিনি।

১৯৯০ সালে গুরুদাসপুর উপজেলার হালসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৯২ সালে নাটোরের নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কুষ্টিয়া শহরে মেসে থেকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন।

স্বপ্নের পথে নতুন সংগ্রাম

২০০০ সালের গোড়ার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন আনোয়ার। কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পর বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করেন। একসময় তার ঘর আলো করে জন্ম নেয় একটি ছেলে সন্তান।

কিন্তু সন্তান জন্মের প্রায় দেড় বছর পর পরিবার জানতে পারেন, সে বাকপ্রতিবন্ধী। এরপর সন্তানের চিকিৎসার জন্য শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। আনোয়ার বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি পেলেও পোস্টিং হয় নাটোরের প্রত্যন্ত এলাকায়। সন্তানের চিকিৎসার প্রয়োজনে রাজধানী থেকে দূরে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি চাকরি ছেড়ে ঢাকায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের আজিমপুর শাখায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

এরপর থেকে সন্তানের চিকিৎসার জন্য দেশে-বিদেশে ছুটতে হয়েছে তাকে। বিশেষ করে ভারতের সিএমসি হাসপাতালে সন্তানের চিকিৎসা করাতে নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়েছে। দীর্ঘ দুই দশকের চিকিৎসায় তার সঞ্চয় বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।

তার ২২ বছর বয়সী সন্তান এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। দু-একটি বাক্য বলতে পারলেও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না। সন্তানের চিকিৎসা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে শিক্ষকতার আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালিয়ে আসছিলেন আনোয়ার।

এবার নিজের চিকিৎসার পালা

কিন্তু ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসা করাতে গিয়ে জানতে পারেন, তার দুটি কিডনিই কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এরপর থেকে শারীরিক অবস্থার ধীরে ধীরে অবনতি হতে থাকে। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে তাকে।

চিকিৎসকরা দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কিডনি প্রতিস্থাপনসহ চিকিৎসার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই তার। দীর্ঘদিন সন্তানের চিকিৎসায় ব্যয় করে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ার পর নিজের চিকিৎসার ব্যয় জোগাড় করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই শিক্ষক।

আলী আনোয়ার বলেন, জীবনের শুরু থেকেই সংগ্রাম করে এসেছেন। সন্তানের চিকিৎসার জন্য নিজের সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করেছেন। এখন নিজের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তার একার পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজের সামর্থ্যবান ও হৃদয়বান মানুষ পাশে দাঁড়ালে তিনি আবারও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান।

তার পরিবারের পক্ষ থেকে মানবিক সহায়তা গ্রহণের জন্য ব্যাংক হিসাব ও বিকাশ নম্বর দেয়া হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব: ০০১২১০০০৩৬৮৫০

হিসাবের নাম: উম্মে কুলসুম কান্তা (স্ত্রী)

ব্যাংক: সাউথ ইস্ট ব্যাংক পিএলসি, ধানমণ্ডি শাখা

বিকাশ: ০১৭১৫৮৬৫১৬১

দুই দশক ধরে সন্তানের চিকিৎসার জন্য লড়াই করা এই শিক্ষক এখন নিজেই জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে। মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতাই তার জন্য বড় আশার কারণ হতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank