শুক্রবার
১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১৪ আগস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের’ ডাক ওয়াংচুকের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
পরিবেশ ও সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত
expand
পরিবেশ ও সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার জন্য ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের’ আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ ও সামাজিক অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি বলেছেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি সম্মানজনক দেশ হিসেবে ধরে রাখতে হলে দেশে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।

স্বাধীনতা দিবসের আগে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের’ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন, এমন ‘নিঃস্বার্থ, নির্ভীক, চরিত্রবান ও যোগ্য’ নারী-পুরুষের নাম প্রস্তাব করতে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

ওয়াংচুক জানান, গত কয়েক দিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। সেই সময় তিনি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পান।

তিনি ভারতের অগ্রগতির সঙ্গে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর অগ্রগতির তুলনা করেন। ওয়াংচুক বলেন, ‘৫০ বছর আগে যেসব প্রতিবেশী দেশ আমাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল বা আমাদের সমপর্যায়ে ছিল, তারা এখন আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’

ওয়াংচুক বলেন, ‘মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির কথা যদি বলি এবং এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে ২০৪৭ সালে আমরা উন্নত দেশ হতে পারব না। এমনকি বিশ্ববাজারে নিজেদের মুখ দেখানোর মতো অবস্থাতেও থাকব না।’

গত দুই মাসে পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন ও প্রতিবাদকারীদের অভিনন্দন জানান ওয়াংচুক। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘একদিকে আমি আপনাদের অভিনন্দন জানাতে চাই। আপনারা পরিবর্তন চেয়েছেন এবং গত দুই মাস ধরে প্রতিবাদ করেছেন। এর ফলে পরিবর্তনও এসেছে।

শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকেও আমি কোনো বড় পরিবর্তনের আশা দেখতে পাচ্ছি না।’ ওয়াংচুক ভারতের ভবিষ্যতের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা দেশের অগ্রগতির ওপরও প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, ‘যতদিন শিক্ষা পিছিয়ে থাকবে, ততদিন দেশের ভবিষ্যৎও পিছিয়ে থাকবে।’

দেশে শাসনব্যবস্থা ও ভিন্নমত দমনকে কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন ওয়াংচুক। তার দাবি, বিভিন্ন দলের সরকার একই ধরনের অবিচার করেছে এবং প্রতিবাদী কণ্ঠ দমন করেছে।

তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে একটি দলের সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করেছে। পরে অন্য রাজ্যে অন্য দলের সরকারও একই ধরনের অবিচার করেছে এবং একইভাবে প্রতিবাদী কণ্ঠ দমন করেছে। তাই বিষয়টি শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নয়।’

২০১২-১৩ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং এর পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ওয়াংচুক। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও দুর্নীতি ও অবিচার পুরোপুরি শেষ হয়নি। ওয়াংচুক বলেন, ‘কিন্তু আজ ১২ বছর পর দুর্নীতি ও অবিচার নতুন রূপ নিয়েছে। আগের তুলনায় এটি এখন দুই থেকে তিন গুণ বড় হয়েছে। এটি আমাদের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।’

ভারতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন সোনম ওয়াংচুক।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এই দেশে একটি বিপ্লব দরকার, তবে সেটি হতে হবে শান্তিপূর্ণ বিপ্লব। যাতে আমরা সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে পারি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা কীভাবে আমাদের নেতৃত্ব বেছে নিই। নেতৃত্ব সঠিক না হলে পুরো দেশই ভুল পথে এগোবে।’

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ওয়াংচুক। তিনি বলেন, অনেক নেতা এখনো সত্য ও ন্যায়ের পথে রয়েছেন এবং তারা সম্মানের যোগ্য। তবে সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ওয়াংচুক বলেন, ‘আপনারা কি জানেন, আমাদের সংসদের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধের মামলা রয়েছে। তাদের এক-তৃতীয়াংশের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশ কীভাবে উন্নতি করবে?’

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা বিরোধী দলকে লক্ষ্য করে নয়। ওয়াংচুক বলেন, ‘আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা বিরোধী দলের কথা বলছি না। আমি দেশের কথা বলছি।’

দেশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে একটি বৃহৎ আলোচনা আয়োজন করতে চান বলেও জানান ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘দেশের যেখানেই থাকুন না কেন, আমি দেশের সেরা মেধাবী ও চিন্তাশীল মানুষদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। কী পরিবর্তন দরকার এবং কীভাবে সেই পরিবর্তন আনা যায়, তা নিয়ে আমরা একসঙ্গে চিন্তা করতে চাই।’

তবে ওয়াংচুক স্পষ্ট করেন, তিনি শুধু বুদ্ধিজীবী বা শিক্ষিত ব্যক্তিদের নিয়েই আলোচনা করতে চান না। তিনি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের যোগ্য ও অভিজ্ঞ মানুষদেরও এই আলোচনায় যুক্ত করতে চান।

ওয়াংচুক তার এক্স পোস্টে বলেন, ‘শুধু চিন্তা করেন এমন বুদ্ধিজীবী নয়, আমাদের দরকার এমন নিঃস্বার্থ ও নির্ভীক নারী-পুরুষ, যাদের চরিত্র ও যোগ্যতা আছে।’ লাদাখে বসবাস করা ওয়াংচুক বলেন, এমন মানুষদের কোথায় পাওয়া যাবে, তা তিনি জানেন না। তাই তাদের খুঁজে বের করতে তিনি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা চান।

তিনি বলেন, ‘লাদাখের প্রত্যন্ত এলাকায় বসে আমি জানি না তারা কারা বা কোথায় আছেন। তাই আপনারা সহযোগিতা করতে পারেন। দেশের এবং আপনাদের নিজ নিজ এলাকার অন্তত একজন এমন যোগ্য মানুষের নাম প্রস্তাব করুন।’

ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক মানুষকে এমন ব্যক্তিদের নাম পাঠানোর আহ্বান জানান এবং বলেন, এটিকে তিনি স্বাধীনতা দিবসের উপহার হিসেবে গ্রহণ করতে চান। তিনি জানান, এমন মানুষের সঙ্গে দেখা করতে চান, যারা মিলে দেশের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করতে পারবেন।

ভারতের কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন, তা জানতে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান ওয়াংচুক। সেখানে তিনি সাধারণ মানুষের পরামর্শ ও মতামত নিতে চান। এক্স পোস্টের শেষে ওয়াংচুক ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করার’ আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করার জন্য মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank