

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গতকাল রাত থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে আবারও ডুবল রাজধানী ঢাকা। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি-সবখানেই এখন থৈ থৈ পানি।
আজ রোববার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের শুরুতেই এই তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অফিসগামী যাত্রী, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি জমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যানবাহন চলাচল, ফলে নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মধ্যরাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা ও ভারী এই বর্ষণের ফলে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না।
সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রিন রোড, তেজতুরী বাজার, পান্থপথ, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মণিপুর, ধানমন্ডি ২৭ ও ৩২ নম্বর, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী, উত্তরাসহ ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ ও দোহার-নবাবগঞ্জের বেশ কয়েকটি এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে।
শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া এলাকার প্রধান সড়কের পাশাপাশি ভেতরের গলিগুলো এখন পানির নিচে। ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরের বেশ কিছু আবাসিক এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমেছে। এছাড়া গ্রিন রোড, পান্থপথ ও কলাবাগানের ভেতরের রাস্তাগুলোতেও কয়েক ঘণ্টা ধরে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দারা জানান, অনেক জায়গায় পানির উচ্চতা হাঁটুর ওপরে উঠে যাওয়ায় মানুষ কার্যত ঘরে বন্দি হয়ে পড়েছে। সরু গলি থেকে প্রধান সড়কে আসাই বাসিন্দাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলাবদ্ধ সড়কের কারণে সকাল থেকেই রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক রাস্তায় পানি মাড়িয়ে গাড়ি চলায় তৈরি হচ্ছে বড় বড় ঢেউ, যা পথচারীদের আরও বিপাকে ফেলছে। ফুটপাতগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে নোংরা পানি মাড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সজিব ব্যাপারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেহেতু ফুটপাত পানির নিচে, তাই আমরা মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছি। তার ওপর সড়কে গাড়ি চলার ফলে যে ঢেউ তৈরি হচ্ছে, তাতে নোংরা পানি ছিটকে এসে জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় হাঁটা এখন আমাদের জন্য শাস্তি।"
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, প্রতিবার বৃষ্টি হলেই এই একই অবস্থা হয়। সকাল থেকেই রাস্তায় হাঁটু পানি। মনে হচ্ছে এই শহরে কোনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাই নেই। আমাদের এই দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।
বেসরকারি চাকরিজীবী রিদিতা ইসলাম ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন,ছাতা নিয়ে অফিসের জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু সড়কে জমে থাকা নোংরা পানিতে জুতা ও কাপড় ভিজে একাকার। অফিসে পৌঁছানোর আগেই খুব অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছি।
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে রাজধানীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেনি। এই চরম পরিস্থিতির কারণে মিরপুরের মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পূর্বনির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
কাজীপাড়ার বাসিন্দা ও এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ইয়াসমিন বলেন, আমি সন্তানকে নিয়ে পরীক্ষার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, কিন্তু গলি থেকেই বের হতে পারিনি। রাস্তায় হাঁটুসমান পানি ছিল। অন্য অনেক অভিভাবকও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। পরে স্কুল থেকে জানানো হয় যে সবার কষ্টের কথা বিবেচনা করে আজকের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
সচেতন নগরবাসী বলছেন, বর্ষা এলেই ঢাকার এই রূপ চিরচেনা হয়ে ওঠে। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচের খতিয়ান দিলেও, সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই তার আসল কঙ্কালসার রূপটি ফুটে ওঠে। দ্রুত ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান না হলে নগরবাসীর এই দুর্ভোগ কোনোদিনই কাটবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।