

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


৬ বছরের শিশু তোসিফ। এই বয়সে যার থাকার কথা ছিল মায়ের আঁচল তলে, বাবার হাত ধরে চেনা ঘরে খেলনা গাড়ি নিয়ে মেতে ওঠার আনন্দে, নিয়তির নির্মম পরিহাসে আজ তার ঠিকানা হয়েছে চার দেয়ালের এক অচেনা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে।
আধো-আধো মিষ্টি বোলে সে নিজের নাম, বাবার নাম 'শরীফ' আর মায়ের নাম 'লাইজু' স্পষ্ট বলতে পারলেও, চেনে না ঘরে ফেরার পথ। এই ব্যস্ত শহরে প্রতিদিন কত মানুষ ছুটে চলে, অথচ এই নিষ্পাপ শিশুটির খোঁজে কেউ একটি বারের জন্যও এগিয়ে আসেনি।
গত ২৪ জুন সকাল আনুমানিক সাড়ে আটটার দিকে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকার একটি ব্যস্ত রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছিল এই অবুঝ শিশুটি। চোখে আতঙ্ক ও আপনজনদের হারানোর বোবা কান্না নিয়ে ঘুরতে থাকা তোসিফকে উদ্ধার করেন এক অজ্ঞাতনামা মানবিক পথচারী। তিনি তাকে সরাসরি নিয়ে যান খিলক্ষেত থানায়।
খিলক্ষেত থানার ডিউটি অফিসার শিশুটিকে নিরাপদ হেফাজতে নিয়ে 'নারী ও শিশু ডেস্ক'-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের কাছে বুঝিয়ে দেন। পুলিশ সদস্যরা পরম মমতায় তাকে শান্ত করেন এবং খাবার দেন। ভয় কিছুটা কাটলে তোসিফ তার ভাঙা ভাঙা ভাষায় নিজের পরিচয় দেয়:
নাম: তোসিফ (আনুমানিক ৬ বছর)
বাবা ও মা: শরীফ ও লাইজু
স্থায়ী ঠিকানা: নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চল
তবে নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে সে কীভাবে এই ঢাকায় এল, কার সাথে এল কিংবা কীভাবে খিলক্ষেতের রাস্তায় একা হারিয়ে গেল- তা এই ছোট্ট শিশুটি কোনোভাবেই বলতে পারছে না।
তোসিফের পরিবারকে দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য খিলক্ষেত থানা পুলিশ এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেয়। থানা কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবালের সাথে।
সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শিশুটির ছবিসহ দেশের মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংবাদপত্রে গুরুত্বের সাথে প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও (ফেসবুক, টুইটার) তোসিফের ছবি ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ পোস্টটি শেয়ার করতে থাকেন।
কিন্তু দিন শেষে এক চরম ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো সবাইকে। এত প্রচার-প্রচারণার পরও খিলক্ষেত বা নিকুঞ্জ এলাকার কোনো পরিবার তোসিফকে তাদের সন্তান বলে দাবি করেনি।
এমনকি নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলের কোনো সূত্র থেকেও তার মা-বাবার সন্ধান মেলেনি। খিলক্ষেত থানায় কোনো মায়ের আকুল করা ফোনকল আসেনি, কোনো বাবা হন্যে হয়ে ছুটে আসেননি।
আইনি প্রক্রিয়া ও বর্তমান ঠিকানা
পুলিশ প্রশাসন প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনিভাবে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মূল কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে দেশের সবকটি থানায় জরুরি বেতার বার্তা পাঠানো হয়েছিল, যেন দেশের কোথাও কোনো শিশু হারানোর জিডি থাকলে তা মিলিয়ে দেখা যায়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও যখন কোনো স্বজনের দেখা পাওয়া গেল না, তখন শিশুটির দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে তাকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একটি নিষ্পাপ শিশু আজ চেনা মানুষের স্পর্শ ছাড়া সম্পূর্ণ এক অচেনা পরিবেশে দিন কাটাচ্ছে। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এই তথ্যটি বেশি বেশি শেয়ার করি। আপনার একটি শেয়ার হয়তো নোয়াখালীর হাতিয়া কিংবা দেশের যেকোনো প্রান্তে থাকা তার বাবা-মায়ের চোখে পড়তে পারে।
জরুরি যোগাযোগের ঠিকানা ও নম্বর:
কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি এই শিশুটিকে চিনে থাকেন বা তার পরিবার সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য জেনে থাকেন, তবে অনুগ্রহ করে নিচের নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করুন:
খিলক্ষেত থানা: ০১৭৪৩২৫২৬৭৯
সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, মিরপুর, ঢাকা: ০১৭১১০৩৪২৬৮
মানবিকতার টানে আমরা সবাই এক হই, যেন তোসিফ দ্রুত ফিরে যেতে পারে তার মায়ের কোল ও নিজের নীড়ে।
