

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


*প্রায় পুরো ঋণই খেলাপি
*দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা
*ঋণ কেলেঙ্কারির পর কঠোর পদক্ষেপ বাংলাদেশ ব্যাংকের
দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে এস আলম সংশ্লিষ্ট চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর (Non-Viable) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় এনে প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজল্যুশন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
অকার্যকর ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।
রেজল্যুশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (CEO) নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের Administrator ও Associate Administrator হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও রেজল্যুশন প্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চার প্রতিষ্ঠানই আর্থিকভাবে চরম দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯.৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮.৫০ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩.৯৩ শতাংশ।
অর্থাৎ চার প্রতিষ্ঠানের ঋণপোর্টফোলিওর প্রায় পুরোটাই খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ঋণ থেকে নিয়মিত আয় এবং নতুন করে ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর মধ্যে এফএএস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সংকটের সঙ্গে পিকে হালদার কেলেঙ্কারির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে। দুদকের মামলার তথ্য অনুযায়ী, অস্তিত্বহীন বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে এফএএস ফাইন্যান্স থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ক্ষেত্রেও পিকে হালদার ও তাঁর সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আর্থিক সংকটের ভয়াবহতা বোঝা যায় ঋণের বিপরীতে থাকা জামানত থেকে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের মূল্য ছিল মাত্র প্রায় ৪৩৭ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ফলে কাগজে থাকা ঋণের বড় অংশ বাস্তবে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে আভিভা ফাইন্যান্সও দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামোয় পরিবর্তন আনার পরও আর্থিক দুর্বলতা কাটেনি। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকেও রেজল্যুশনের আওতায় আনতে হলো।
শুধু এই চার প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (NBFI) খাতই বড় সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ৩০টি এনবিএফআইয়ের মোট ঋণ ছিল প্রায় ৫৬ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা, যার মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণ ছিল ২৩ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ খাতটির মোট ঋণের প্রায় ৪১ শতাংশই খেলাপি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এবারের পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য শুধু দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নয়; বরং এসব প্রতিষ্ঠানের অবশিষ্ট সম্পদ সংরক্ষণ, অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষা করা।
এখন রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে কতটা সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব এবং সেই অর্থের কতটা আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া যাবে। বিশেষ করে যেসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই, সেগুলো আদায় এবং অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করাই হবে প্রশাসকদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত আর্থিক খাতে একটি কঠোর বার্তাও দিচ্ছে—দীর্ঘদিন ধরে মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানকে কেবল নতুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে রেজল্যুশনের মাধ্যমে কাঠামোগত সমাধানের পথ নেওয়া হবে।