


দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে পাচার করা হয়েছে বিদেশে। এর ফলে ঋণখেলাপি হয়েছেন অনেকে। খেলাপি হওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদের সন্ধান করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে এবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে। এ জন্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের আইন, ফরেনসিক ও সম্পদ অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন ৪২টি ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে তাদের বিদেশে থাকা সম্পদ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সংক্রান্ত একটি সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বর্তমানে বিভিন্ন ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে কিংবা ঋণখেলাপি নিজেরাই বিদেশে পলাতক রয়েছেন। এমনকি খেলাপি ঋণগ্রহীতার নামে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নানা ধরনের আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সম্পদ অনুসন্ধান ও জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো অগ্রিম বা নির্দিষ্ট ফি না দিয়ে ‘No Win, No Pay’ ভিত্তিতে কাজ করানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ বা উদ্ধার করা সম্ভব হলে তবেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পারিশ্রমিক পাবে।
এটি কার্যকর হলে বিদেশে পাচার করা অর্থ উদ্ধারে সরকারের প্রাথমিক ব্যয় ও ঝুঁকি কমবে। তবে একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া সম্পদের বিপরীতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কত শতাংশ বা কী পরিমাণ পারিশ্রমিক দিতে হবে, সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সরকারের গঠিত যৌথ তদন্ত দলের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে ১১টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ কাজে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট ইউনিট এবং আয়কর বিভাগের সমন্বিত কার্যক্রমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাগত প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধানে এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে কাজে যুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সম্পদ শনাক্তকরণ, আইনি অনুসন্ধান, সম্পদের মালিকানা যাচাই এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা করবে।
প্রথম পর্যায়ের পর সিআইডির তথ্যের ভিত্তিতে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয় পর্যায়ে অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
এ জন্য আটটি বিদেশি আইন ও পেশাগত প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপ্যাথ, বিজিসি অ্যান্ড এইচএইচআর ও অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
এসব প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সম্পদ অনুসন্ধান, করপোরেট মালিকানা যাচাই, আর্থিক লেনদেনের অনুসরণ এবং আন্তঃদেশীয় আইনি প্রক্রিয়ায় কাজ করতে পারে।
নথিতে প্রাথমিকভাবে যেসব দেশে পাচারকৃত অর্থ বা সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া।
অর্থাৎ অনুসন্ধানের পরিধি শুধু কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ব্যাংকঋণের অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে জমি, বাড়ি, কোম্পানি, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার কিংবা অন্য কোনো সম্পদে বিনিয়োগ করা হয়ে থাকলে তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদ এবং টাকা ফেরত আনা। কোনো দেশে সম্পদের অস্তিত্ব শনাক্ত করাই অর্থ উদ্ধারের শেষ ধাপ নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, সম্পদ জব্দের আইন, মালিকানা কাঠামো এবং অর্থ পাচারের প্রমাণ—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
নথিতেও বলা হয়েছে, বিদেশে কোনো সম্পদ শনাক্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে তা বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে তাই এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের ওপর নয়; দেশীয় তদন্তে তথ্যের মান, পাচারের অর্থের উৎস প্রমাণ, বিদেশি আদালতে বাংলাদেশের দাবির আইনি ভিত্তি এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা কতটা কার্যকর করা যায়—তার ওপর।
এদিকে ৪২টি বড় ঋণখেলাপির মধ্যে কারা রয়েছেন এবং তাদের বিদেশে কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে সে বিষয়ে কিছু প্রকাশ করা হয়নি। এই তালিকা প্রকাশ করা হলে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগের প্রকৃত চিত্র অনেকটাই সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, 'ব্যাংকগুলোর সুবিধার্থে আমরা প্রাথমিকভাবে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত করেছি। এসব প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের হার অনেক বেশি এবং এসব কাজে তারা প্রমাণিত সফল। তবে এর বাইরেও ব্যাংকগুলো চাইলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে।'
প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে চুক্তিতে অংশীদারত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র বলেন, 'বিষয়টি আমরা এখনই প্রকাশ করছি না। এটি নির্ভর করবে কোন কোম্পানি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। কেইস টু কেইস নির্ভর করবে পাওনাদির বিষয়ে। এছাড়া সবার সম্পদের পরিমাণ তো এক না।'
চুক্তিবদ্ধ আটটি প্রতিষ্ঠানের কার অভিজ্ঞতা কেমন:
আট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, Grant Thornton, Kroll, Baker McKenzie, PwC, DLA Piper, Dentons, Rahman Ravelli ও Interpath-এর আন্তর্জাতিক asset tracing, fraud investigation বা recovery-সংক্রান্ত প্রকাশ্য অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে RI Consortium এবং BCG & HHR-এর ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ পরিচয় ও পূর্ববর্তী কাজের রেকর্ড স্পষ্ট নয়, যা সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। একইভাবে Animus Associates-এর সেবা তালিকায় asset tracing ও recovery থাকলেও বড় আন্তর্জাতিক recovery-এর প্রকাশ্য রেকর্ড তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে ৪২ বড় ঋণখেলাপির সম্পদ উদ্ধারে তাদের নিয়োগের শর্ত, সাফল্যভিত্তিক পারিশ্রমিক এবং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে কোন ঋণখেলাপির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এসব কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকার।
তিনটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করলে আরিফ হোসেইন খান বলেন, 'আমরা এই ৮ প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে চূড়ান্ত করিনি। আমরা প্রস্তাব করেছি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর বাইরেও কোনো ব্যাংক যদি চায় বা তাদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে এমন কোনো সুযোগ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা চুক্তি করতে পারে।'