


রপ্তানি আয় নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যেই আছে। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পণ্য রপ্তানি আয় কমেছে, বিপরীতে রেমিট্যান্সে হয়েছে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। আগস্টের প্রথম ১২ দিনেও সেই গতি অব্যাহত থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে এখন রেমিট্যান্সই বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র দেখা গেছে।
সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এসেছে ৪৩৫ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৫৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪৩ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলার, বা ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে দেশের পণ্য রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৪৭২ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ০ দশমিক ৯ শতাংশ কম। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৭৭ কোটি ডলার।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দুই প্রধান উৎসের মধ্যে রপ্তানিতে যখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, তখন রেমিট্যান্সে হয়েছে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি। জুলাই মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
আগস্টের প্রথম ১২ দিনে এসেছে আরও ১৪৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১০৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ মাত্র ১২ দিনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২ দশমিক ২ শতাংশ। ১২ আগস্ট একদিনেই দেশে এসেছে ১১ কোটি ১০ লাখ ডলার।
সব মিলিয়ে জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত যে ৪৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, তা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াচ্ছে না; রপ্তানি আয়ে দুর্বলতার সময় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ সামলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
•রপ্তানি খাতে চাপের কারণ কী
রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন বাজারে বাণিজ্যিক চাপের কারণে খাতটি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
জুলাইয়ে মোট পণ্য রপ্তানি প্রায় ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। যদিও আগের মাস জুনের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে, বছরওয়ারি হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক। অর্থাৎ মাসভিত্তিক কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ থাকলেও রপ্তানি খাতে এখনো স্থায়ীভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফেরেনি।
রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গত বছরের তুলনায় অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসা। জুলাই থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত এসেছে ৮২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে এর মূল্য প্রায় ১০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ রপ্তানি আয় যখন কিছুটা চাপের মধ্যে, তখন শুধু এক বছরের ব্যবধানেই অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি সমপরিমাণ প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে যুক্ত হয়েছে।
•রিজার্ভ ও বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি
রেমিট্যান্স সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায়। ফলে আমদানি দায় পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেন এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে। রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহের সক্ষমতাও বাড়ায়। এ কারণে রপ্তানি আয় দুর্বল থাকলেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক খাতে কিছুটা ভারসাম্য তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রেমিট্যান্স বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এর প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার ভারসাম্য শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। রপ্তানি আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় সেখানে টেকসই প্রবৃদ্ধি ফেরানো জরুরি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেইন খান এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘প্রবাসী আয় সবসময়ই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই একটি মাত্র খাত যেখান থেকে আয় আসে কোনো ব্যয় ছাড়াই। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে একটি ডলার আনতে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। সে হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দিক থেকে রেমিট্যান্সের মত বিকল্প আর নেই। এদিকে এই খাতের উপর ভর করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুসংহত হচ্ছে।’
রপ্তানি আয়ের এ ধারা নিম্নগামী হওয়ায় ব্যবসায়ীরা দায় দিচ্ছেন দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘এখনতো সরকারের মাত্র ৬ মাস চলছে। তাই কিছু বলা যায় না। কিন্তু আমাদের তো আর এই পরিস্থিতি ৬ মাস ধরে চলছে না। আমরা গেল ৩ টা বছর ধরে এই দূর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। গ্যাসের দাম বাড়ালো ৩০ শতাংশ। দাম দিয়ে গ্যাস কিনেও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না। যার কারণে উৎপাদন নেমেছে ৪০ শতাংশে। আমরা কোনোভাবেই কোমড় সোজা করে দাঁড়াতে পারছি না।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর প্রশাসক ফজলুল হক এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একটি সমস্যাপ্রবণ সময় যাচ্ছে। তবে আমরা এ বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে আশ্বস্ত হয়েছি খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হবে। রপ্তানি আয় না বাড়াতে পারলে দেশের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে বেকারত্ব হুমকিতে পড়বে দেশ।’
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৪৩ দিনে রেমিট্যান্সে ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেই ব্যবধানকে আরও দৃশ্যমান করেছে। রপ্তানি আয় ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।