

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বিষয়ে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় অংশগ্রহণ বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ের একটি শিক্ষার্থী সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করেছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রতিষ্ঠানটি মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীর আইইডিসিআর অডিটোরিয়ামে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ওয়াটারএইড বাংলাদেশ।
‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর): সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা ও উপলব্ধি’ শীর্ষক এ কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ছিল-‘পরিবেশ থেকে সমাজ: তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এএমআর’।
কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ক্রমবর্ধমান হুমকি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বৃদ্ধি, সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফার্মেসি, পরিবেশ বিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা কার্যক্রমে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে আইইডিসিআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রফেসর ডা. জাকির হোসেন হাবিব পোস্টার প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।
তিনি একইসঙ্গে ‘দ্য সাইলেন্ট প্যানডেমিক অব এএমআর: সেফগার্ডিং আওয়ার ফিউচার অ্যাগেইনস্ট ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
কর্মসূচির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল কুইজ প্রতিযোগিতা, পোস্টার উপস্থাপনা এবং ভিডিও কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রদর্শনী।
কুইজ প্রতিযোগিতা দুটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়- প্রথমে অনলাইন মূল্যায়ন এবং পরে এএমআর-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে তাৎক্ষণিক বক্তৃতা।
পোস্টার উপস্থাপনার বিষয় ছিল ‘ওয়ান হেলথ পদ্ধতিতে এএমআর–WASH সংযোগ’, এবং ভিডিও কনটেন্টে তুলে ধরা হয় ‘জনধারণায় এএমআর এবং করণীয়।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। পোস্টার ক্যাটাগরিতে প্রথম ও তৃতীয় স্থান অর্জন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, এবং দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ভিডিও ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান লাভ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৃতীয় স্থান পায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি দল।
কুইজ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মি. রাতুল হাসান। প্রথম রানার-আপ হন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মিস শর্মিলা সাজাঙ্কা খান এবং দ্বিতীয় রানার-আপ হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মি. নাজমুস সাকিব ।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি বিভাগের ডিন প্রফেসর ডা. মো. সেলিম রেজা বলেন, মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখতে এএমআর বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন ব্যক্তিরাও অনেক সময় নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ মাত্রা গ্রহণ করেন না। একইসঙ্গে ওভার-দ্য-কাউন্টার ওষুধ বিক্রি ও প্রচার নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এ উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।
তিনি ভবিষ্যতে আরও এ ধরনের সহ-সৃজনমূলক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং ল্যাবরেটরি তথ্যভিত্তিক আলোচনার ওপর জোর দেন।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ -এর জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. জিনাত জেবিন হোসেন বলেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করে এ ধরনের উদ্যোগে অংশীদার হতে আগ্রহী তাদের প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসি উইং-এর সহকারী পরিচালক ডা. সামসাদ রব্বানী খান শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান, প্রত্যেকে যেন অন্তত পাঁচ থেকে দশজন মানুষের মধ্যে এএমআর সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, মানব ও প্রাণী এএমআর-এর পাশাপাশি পরিবেশগত এএমআর নজরদারি এখন অত্যন্ত জরুরি।
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পক্ষ থেকে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রকল্প সমন্বয়কারী মি. মামুন চৌধুরী বলেন, সুইডেন সরকারের অর্থায়নে ওয়াটারএইড স্বল্প আয়ের বসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমস্থলে ওয়াশ ও স্বাস্থ্যবিধি উন্নয়নে কাজ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে এএমআর একটি নতুন কর্মক্ষেত্র হলেও ভবিষ্যতে এ খাতে কাজ সম্প্রসারণের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণা স্বাগত জানানো হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. এএসএম আলমগীর ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানবস্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রাণী ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মেসিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ওয়ান হেলথ ধারণার আরও সমন্বয়, পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা এবং মলিকিউলার বায়োলজি সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিকেল মাইক্রোবায়োলজির সভাপতি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, পোল্ট্রি চর্চা, স্বাস্থ্যবিধি ও ওয়াশ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এএমআর বিস্তারের অন্যতম কারণ।
তিনি পরিবেশগত এএমআর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণের গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেন।
সমাপনী বক্তব্যে আইইডিসিআর-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা প্রফেসর ডা. জাকির হোসেন হাবিব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও উৎসাহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি ও রিসোর্স পারসনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডা. আহমেদ নওশের আলম (পিএসও, আইইডিসিআর), ডা. এম. সেলিম উজ্জামান (ফিজিশিয়ান সায়েন্টিস্ট ও কনসালট্যান্ট, ইআইডি ও ওয়ান হেলথ), ডা. মালিহা শিফা (হেলথ স্পেশালিস্ট, ওয়াটারএইড বাংলাদেশ), ডা. সায়মা বিনতে গোলাম রসুল, ডা. নন্দিতা বণিক (ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ) এবং প্রফেসর ডা. সাকিবা ইয়াসমিন (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়)।
মন্তব্য করুন