শুক্রবার
১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমুদ্রগামী ট্রলার নির্মাণে ব্যস্ত ডক শ্রমিকরা

‎রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
‎রাঙ্গাবালীতে সমুদ্রগামী ট্রলার নির্মাণে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন ''ডক শ্রমিকরা''
expand
‎রাঙ্গাবালীতে সমুদ্রগামী ট্রলার নির্মাণে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন ''ডক শ্রমিকরা''

‎দূর থেকেই দেখা যায় মাছ ধরার ট্রলারের উঁচু মাস্তুল। কাছে আসতেই দেখামেলে নতুন কাঠের উপরে টাকুর টুকুর শব্দে দেশীয় (ডক শ্রমিক) কারিগরদের নিপুন হাতে তৈরি বঙ্গোপসাগরগামী মাছ ধরার ট্রলার। শীতের মিষ্টি রোদের সূর্য মাথায় নিয়েই তুমুল ব্যস্ততার এমন দৃশ্য দেখা গেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার আগুনমুখা নদীর তীরে।

আরো দেখা যায়, শীতের মধ্যেও কারিগরদের ঘর্মাক্ত ও কর্মক্লান্ত। অন্যদিকে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে হাত উচকিয়ে সবাইকে মন দিয়ে কাজ করতে হাঁক ডাক দিচ্ছেন হেড মিস্ত্রি।

‎জানা গেছে, এখানকার এক একটি মাছ ধরার ট্রলার মহাজনের ইচ্ছার ওপরে আকৃতি নির্ধারণ করে প্রতি বছরই কারও না কারোর এই আগুনমুখার তীরে ট্রলার তৈরি হয়ে থাকে।

হেড মিস্ত্রি রাখাল মন্ডল ট্রলার তৈরির দীর্ঘ ৪০ বছর কাজের অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘একটি সমুদ্রগামী ট্রলার তৈরি করার আগে ছবি একে গ্রাফ করে নিতে হয়। ট্রলার মহাজনরা যেমন চায় তেমনিই তৈরি করে থাকি। তাছাড়া কিভাবে কি করতে হবে তা মাথার ভিতরে থাকে। এক একটি ট্রলার আকার ভেদে খরচ নির্ধারণ হয়ে থাকে। তবে সমুদ্রগামী বড় একটি ট্রলার নির্মাণে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ‎এক সময় ওস্তাদের হাত ধরে ট্রলার নির্মাণশিল্পে ঢুকে পড়ার পর এখন পর্যন্ত অসংখ্য ট্রলার তৈরি করে সাগরে ভাসিয়েছি। তিনি আরো বলেন, একটি ট্রলার তৈরিতে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময় লাগে। ট্রলার তৈরি হয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, মহাজনের সঙ্গে চুক্তি থাকে সাগরে ভাসিয়ে এক দিন চালানোর পর যদি কোনো সমস্যা দেখা না দেয় তাহলেই আমাদের মত একজন মিস্ত্রির দায়িত্ব শেষ।’ ‎ট্রলার তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিক সুজিৎ জানান, ‘আমরা কখনো চুক্তিতে আবার কখনো দৈনিক বেতনে কাজ করে থাকি। কেউ কেউ দৈনিক মজুরীতে ১ থেকে দের হাজার টাকাও পাচ্ছি। আবার যারা ভালো কাজ পারেন, তারা দুই হাজার টাকাও পান। আবার অনেকে ৫০০ টাকার মজুরিতে আছেন। আমার সংসারে বা বংশে কেউ ট্রলার মিস্ত্রি না হলেও এক ওস্তাদের হাত ধরে এই পেশায় আসছি। এবং নিজে কাজ করে সংসার কুশলেই চালাচ্ছি।’ ‎আরেকটি নির্মাণাধীন ট্রলারের হেড মিস্ত্রি ফারুক জানান, ‘আমার এই ট্রলারটির দৈর্ঘ্যে ৫৪ ফুট, উচ্চতায় ১০ ফুট। প্রস্থে পেছনের দিকে ১০ ফুট। তবে মাস্তুলের দিকে পর্যায়ক্রমে প্রস্থমাপ সংকীর্ণ হয়ে আসে। মাস্তুলটি তৈরি করা হয় একটি আস্ত গাছ দিয়ে। মাস্তুলের গাছটির ব্যাস নূন্যতম ১০ ফুট হতে হয়। ওদিকে গলুইয়ের নিচটা সাধারণত আট ফুট পরিমাপের হয়। ট্রলারে পাঁচ ইঞ্চি থেকে কমপক্ষে দুই ইঞ্চি লোহা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেহেতু ট্রলারে পুরো কাঠ ব্যবহার করা হয়, সে কারণে মূল কাঠামোতে অধিকাংশ লোহার পরিমাপই হচ্ছে পাঁচ ও চার ইঞ্চি করে।

‎ তিনি আরও বলেন, ট্রলার তৈরিতে রেন্ট্রি, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠ ব্যবহার করা হয়।’ ‎ট্রলার মহাজন মাছুম মল্লিক জানান, ‘আমার ট্রলারটি নির্মানে সবমিলিয়ে প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। আর এসব ট্রলার সর্বোচ্চ ১০ বছর ভালো থাকে। সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে ভাগ্য ভালোহলে অর্ধকোটি টাকা লাভ করা যায়। আর ভাগ্য খারাপ হলে প্রতি ট্রিপে ১ থেকে দের লাখ টাকা লোকসান হয়।

‎তবে আগে বোট নামানোর এক মৌসুমেই বোট খরচ উঠে যেত। কিন্তু এখন তিন বছরেও খরচ ওঠে না। সমুদ্রের এই মাছ ধরার ট্রলার ব্যবসায় লাভের চেয়েও লোকসানের ঝুঁকি বেশি। সমুদ্রের পাড়ের মানুষ এই ব্যবসায় কেউ লাখপতি আবার কেউ কেউ নিঃস্ব হয়ে গেছে।’ ‎উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অঃদাঃ) মোঃ জহিরুন্নবী জানান, ‘বিভিন্ন সময়ের বৈরী আবহাওয়ার কারনে সাগর থেকে হতাশ হয়ে তীরে ফেরেন মৎস্যজীবীরা। তারপরেও তারা ভেঙে পড়েন না। তৈর করেন নতুন নতুন মাছ ধরার ট্রলার। এই নির্মাণ শিল্পে পৃষ্ঠপোষকতা করলে জেলেরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। নৌ চলাচলের রুট ভরাট হয়ে যেতে পারে কিন্তু সমুদ্রের মৎস্য আহরণের সম্ভাবনার সহযোগী ট্রলার নির্মাণ শিল্পে মাছ শিকারের জন্য চাহিদা বেড়েই যাবে।’ ‎

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Spain VS Belgium
Scheduled
11 Jul, 01:00 AM
VS
World Cup