বুধবার
০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে তালপাতার হাতপাখা

রামগতি-কমলনগর(লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

“তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে…” একসময় এই গানটি শুধু সুরের মূর্ছনা ছিল না, ছিল বাংলার মানুষের জীবনযাপনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বৈদ্যুতিক পাখা, সৌরবিদ্যুৎ কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের যুগ আসার বহু আগে প্রচণ্ড গরমে স্বস্তির একমাত্র ভরসা ছিল তালপাতার হাতপাখা। রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে কৃষকের কুঁড়েঘর, জমিদারবাড়ি থেকে সাধারণ মানুষের সংসার, সবখানেই ছিল এর সমান কদর। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের এই লোকঐতিহ্য। তবে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের জোহরা বেগমের হাতে এখনও বেঁচে আছে বাংলার সেই প্রাচীন ঐতিহ্য।

ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে তালপাতা ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হাতপাখার ব্যবহার দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন বাংলা, মগধ ও গৌড় অঞ্চলে তাল, খেজুর ও বাঁশের তৈরি হাতপাখা দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল। পাল ও সেন আমলে রাজদরবার, বৌদ্ধ বিহার এবং হিন্দু মন্দিরে রাজা, গুরু ও অতিথিদের বাতাস করার জন্য হাতপাখা ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সুলতানি ও মুঘল আমলেও রাজা-বাদশাহ, নবাব ও জমিদারদের দরবারে দাস-দাসীরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। ধীরে ধীরে এটি অভিজাত সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে তালপাতার হাতপাখা ছিল শুধু গরম নিবারণের উপকরণ নয়, ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। একসময় নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর সময় খাট, আলমারি, কাঁথা-বালিশ, পিতলের তৈজসপত্রের পাশাপাশি একটি বা একাধিক নকশা করা তালপাতার হাতপাখাও দেওয়া হতো। অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় মাহফিল, ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দির, গ্রামীণ সালিশ, পাঠশালা কিংবা কৃষকের মাঠের বিশ্রাম সব জায়গাতেই হাতপাখার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রীষ্মের রাতগুলোতে পরিবারের একজন সদস্য অন্যদের বাতাস করতেন এই হাতপাখা দিয়ে, যা ছিল বাংলার পারিবারিক জীবনের এক চিরচেনা দৃশ্য।

তালপাতার হাতপাখা তৈরির প্রক্রিয়াও এক ধরনের লোকশিল্প। পরিপক্ব তালপাতা সংগ্রহ করে প্রথমে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। এরপর পাতাগুলো সমান করে কেটে বাঁশ বা বেতের চিকন কাঠামোর সঙ্গে নিখুঁতভাবে বসানো হয়। শক্ত সুতা দিয়ে চারপাশ সেলাই করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। সবশেষে বাঁশ বা কাঠের হাতল লাগিয়ে তৈরি হয় একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হাতপাখা। প্রতিটি পাখা তৈরিতে প্রয়োজন হয় ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও দক্ষ হাতের ছোঁয়া।

একসময় কমলনগরসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক পরিবার এই হাতপাখা তৈরি করে সংসারের বাড়তি আয় করত। স্থানীয় হাট-বাজার, বিভিন্ন মেলা এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে এসব পাখার ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক পাখা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে সেই চাহিদা এখন প্রায় বিলীন। ফলে একের পর এক কারিগর এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম আনন্দপুর গ্রামের জোহরা বেগম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজ হাতে তালপাতার ঐতিহ্যবাহী হাতপাখা তৈরি করে চলেছেন। তাঁর বিশ্বাস, এটি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের জীবন্ত স্মারক। আধুনিকতার স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তিনি এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

লোকসংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তালপাতার হাতপাখা আবারও দেশীয় হস্তশিল্প হিসেবে নতুন পরিচয় পেতে পারে। অন্যথায় বাংলার হাজার বছরের এই ঐতিহ্য অচিরেই শুধু বইয়ের পাতায় আর স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
France VS Morocco
Scheduled
10 Jul, 02:00 AM
VS
World Cup