শনিবার
২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আগাম বন্যায় হবিগঞ্জে ৩৪০ কোটি টাকার ফসলহানি, দিশেহারা কৃষক

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ০১:০৫ পিএম
ফাইল ছবি
expand
ফাইল ছবি

টানা বৃষ্টিপাত, কালবৈশাখী ঝড় এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। আগাম বন্যা ও নদীর বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জেলার কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হবিগঞ্জে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার কৃষি ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ধান, যা হাওরাঞ্চলের মানুষের প্রধান অর্থকরী ফসল এবং সারা বছরের জীবিকার অন্যতম ভরসা।

হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার পাল এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার বিভিন্ন হাওরে ইতোমধ্যে প্রায় ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেক জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে, আবার অনেক জায়গায় আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এতে হাজার হাজার কৃষক বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট জমির একটি বড় অংশ আকস্মিক বন্যা ও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে দিন দিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, লাখাই, নবীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলার হাওরাঞ্চল। এর মধ্যে বানিয়াচং উপজেলার খোয়াই নদীর বাঁধ এবং বাহুবল উপজেলার করাঙ্গী নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন করে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে নেমে এসেছে চরম হতাশা।

জেলা কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে প্রায় ২১ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেছে। তবে স্থানীয় কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা আরও বেশি।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, অনেকেই ব্যাংক ঋণ, এনজিও ঋণ কিংবা ধার-দেনা করে বোরো আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলনের আশায় বুক বাঁধলেও হঠাৎ বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে সবকিছু তলিয়ে গেছে। এখন ঋণ পরিশোধ, সংসার চালানো এবং আগামী মৌসুমে নতুন করে চাষাবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।

বানিয়াচং উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, ধান পাকতে আর মাত্র কয়েকদিন বাকি ছিল। কেউ কেউ নৌকা দিয়ে পানির নিচ থেকে ধান কাটার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রবল স্রোত ও পানির চাপে অনেক জমির ধান উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, যেসব কৃষক আগেভাগে ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছিলেন, তারাও নতুন বিপদের মুখে পড়েছেন। টানা বৃষ্টির কারণে পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকাতে না পেরে অনেক স্থানে পচে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ধানের শীষে চারা গজিয়ে গেছে, ফলে বাজারমূল্যও হারাচ্ছে সেই ধান।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছরই বাঁধ ভাঙন, পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং টেকসই অবকাঠামোর অভাবে হাওরাঞ্চলে এমন বিপর্যয় দেখা দেয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় কৃষকদের দুর্ভোগ কমছে না।

এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নিরূপণের কাজ চলছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তা, কৃষি প্রণোদনা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সচেতন মহলের মতে, দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Croatia VS Ghana
Scheduled
28 Jun, 03:00 AM
VS
World Cup