সোমবার
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে এক বিদেশি পরিবারের করুণ পরিণতি

শাহীন মাহমুদ রাসেল
প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
expand

সমুদ্র তখনো শান্ত মুখোশ পরে ছিল। বাঁকখালীর মোহনা পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে এগিয়ে চলা কাঠের ক্যাটামারানটির ডেকে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক বৃদ্ধ- চুয়াত্তর বছর বয়সী জন এডওয়ার্ড পাডনি। পাশে তার তেরো বছরের ছেলে রালফ। নৌকার মাঝামাঝি জায়গায় ছিলেন স্ত্রী বেলা, কোলঘেঁষে ষোলো বছরের আলবার্ট।

চারজন মানুষ, একটি নৌকা, আর একটাই স্বপ্ন- সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একদিন ফিরে যাওয়া নিউজিল্যান্ডে। তারপর হঠাৎই বদলে গেল সব হিসাব। রালফের চোখ প্রথম আটকায় নৌকার জোড়া লাগানো অংশে। দুই খোলের ক্যাটামারানটিকে যেখানে ভারী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া দেওয়া হয়েছিল, সেখানেই ফাটল ধরছে ধীরে ধীরে। জন দ্রুত হাল ঘোরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ততক্ষণে ঢেউয়ের তেজ বেড়ে গেছে বহুগুণ। একের পর এক কাঠের গুঁড়ি ভাঙতে থাকে, আর তারপর- এক বিশাল ঢেউয়ের ধাক্কায় দুই টুকরো হয়ে যায় আটান্ন ফুট লম্বা হাউজবোট 'আইল্যান্ড গার্ল'।

চারজন মানুষ একসঙ্গে ছিটকে পড়েন উত্তাল পানিতে। চারপাশে তখন শুধু ভাঙা কাঠ, ফেনায়িত ঢেউ আর আতঙ্ক। সাঁতার জানতেন না জন। ভাঙা নৌকার একটা টুকরো আঁকড়ে ধরে তিনি ভেসে থাকার মরিয়া চেষ্টা করছিলেন। রালফ কোনোমতে সাঁতরে বাবার কাছে পৌঁছে তাকে টেনে তোলে ভাঙা অংশের ওপর। কিন্তু বাকি দুজন- বেলা আর আলবার্ট কোথায়, তখনো জানা নেই কারও।

জন ছেলেকে পাঠান লাইফবোট আনতে, নির্দেশ দেন মা ও ভাইকে খুঁজে বের করার। কিন্তু ভাঙা নৌকার দুই টুকরো তখনও পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত প্রবল ঢেউয়ে। সেখানে পৌঁছানো ছিল প্রাণঘাতী ঝুঁকির কাজ। একসময় ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন বেলা, উঠে পড়েন লাইফবোটে। কিন্তু আলবার্ট পারেনি। পরে জনকে বেলা জানান, নৌকার একটা ছাউনির নিচে ছেলেকে ধরে রেখেছিলেন তিনি- সেখানে সামান্য বাতাসের পকেট ছিল। ছেলের মাথাটা পানির ওপরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন মা।

শুরুতে শ্বাস নিচ্ছিল আলবার্ট। তারপর একসময় বন্ধ হয়ে যায় বুদবুদ ওঠা। আর কোনো সাড়া মেলেনি। কয়েক দিন পর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাছে ভেসে ওঠে তার মরদেহ।

'আইল্যান্ড গার্ল' নিছক কোনো নৌকা ছিল না। এটি ছিল একটি পরিবারের ছয় মাসের ঠিকানা। দুই খোলবিশিষ্ট এই ক্যাটামারানের দুই অংশ জোড়া দেওয়া হয়েছিল মোটা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে, মাঝে চওড়া প্ল্যাটফর্ম, সামনের দিকটা খোলা, ওপরে ত্রিপলের ছাউনি। ছয়টি কক্ষ, দুটি ১২০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন- সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল জনের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের প্রকল্প।

পরিবারটি প্রথম বাংলাদেশে পা রাখে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর দশ-বারোবার আকাশপথে যাতায়াত করেছে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে। জন নিজে কাঠের বাড়ি ও নৌকা বানানোর কাজে যুক্ত ছিলেন বহু বছর।জর্জিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে সরকারি বনভূমি ইজারা নিয়ে কাঠের বাড়ি বানিয়ে বিক্রি করাই ছিল তার পেশা। নিউজিল্যান্ড ছাড়ার আগে প্রায় এক দশক কোস্ট গার্ডেও কাজ করেছেন তিনি, পরে থেকেছেন জর্জিয়া ও থাইল্যান্ডে।

তাই কক্সবাজারে এসে কাঠের ক্যাটামারান বানানোর সিদ্ধান্ত জনের কাছে আকস্মিক কিছু ছিল না। বাংলাদেশ বেছে নেওয়ার কারণ ছিল সহজলভ্য কাঠ। কক্সবাজারের এসএম পাড়ার এক নৌকা তৈরির কারখানায় স্থানীয় কারিগরদের হাত ধরে জন্ম নেয় 'আইল্যান্ড গার্ল'। মূলত গর্জন কাঠে তৈরি।

জনের ভাষায়, গর্জন গাছ পাওয়া যায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে, তবে বাংলাদেশে এই গাছ কাটার ওপর বিধিনিষেধ আছে। তাই তিনি আইনি প্রক্রিয়া মেনেই কাঠ সংগ্রহ করেছিলেন বলে দাবি করেন। দুই খোল জোড়া দিতে কিনেছিলেন ছয়টি উন্নতমানের গর্জন কাঠের গুঁড়ি। পরিকল্পনা ছিল পাঁচ-ছয় মাসে নৌকা শেষ করার, কিন্তু বাস্তবে সময় লাগে দেড় বছরেরও বেশি। আর খরচ গিয়ে ঠেকে প্রায় দেড় কোটি টাকায়।

২০২৫ সালের জুনে কক্সবাজার শহীদ মিনারের বিপরীতে আল-বারাকা টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন জন। প্রায় ছয় মাস সেখানে থাকার পর ধীরে ধীরে নৌকাই হয়ে ওঠে পরিবারটির ঘর। বাঁকখালী নদীতে বিআইডব্লিউটিএ ঘাটের কাছে নোঙর করে বসবাস শুরু করেন তারা। খাওয়া, ঘুম, দৈনন্দিন জীবন, সবকিছুই নৌকায়।

পরিকল্পনা ছিল সুনির্দিষ্ট। বাংলাদেশের নদীপথ ধরে সমুদ্রে পৌঁছানো, তারপর সাগর পাড়ি দিয়ে ফেরা নিউজিল্যান্ডে। এরই মধ্যে একবার নৌকায় চট্টগ্রাম যান তারা। ফেরার পথে সোনাদিয়া দ্বীপে নোঙর করেন। আর সেখানেই নেমে আসে আরেক দুর্যোগ। ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল সোনাদিয়ায় অবস্থানকালে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায় পরিবারটির ওপর। কোস্ট গার্ডের একটি দল তাদের উদ্ধার করে, লুট হওয়া জিনিসপত্রের বড় অংশও উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল তখন।

জনের ইচ্ছা ছিল চট্টগ্রাম থেকে থাইল্যান্ডের দিকে যাত্রা করার, কিন্তু সেখানে ডিজেল সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ডিজেল সংগ্রহের জন্যই তারা কক্সবাজারে ফিরছিলেন, আর পথিমধ্যে সোনাদিয়ায় নোঙর করার সময়ই ঘটে হামলার ঘটনা। সর্বশেষ পরিকল্পনা ছিল, অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ আইল্যান্ড গার্লে চড়ে বাংলাদেশ ছাড়বেন তারা- গন্তব্য নিউজিল্যান্ড। কিন্তু সেই যাত্রা আর কখনো শুরু হলো না।

দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। আদৌ কি সমুদ্রে চলার উপযোগী ছিল আইল্যান্ড গার্ল? কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া দেওয়া দুটি খোল কি বঙ্গোপসাগরের বিশাল ঢেউ সামলানোর মতো মজবুত ছিল? মাঝের প্ল্যাটফর্ম কি গভীর সমুদ্রের জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল? আর ব্যবহৃত কাঠের মানই বা কেমন ছিল?

জন নিজে অবশ্য নকশায় কোনো ত্রুটি স্বীকার করতে নারাজ।

তার দাবি, কাঠের নৌকা বানানোর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তার আছে, আর নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় ক্যাটামারানের ব্যবহার সুপরিচিত। তার মতে, সমস্যা ছিল নকশায় নয়, কাঠে। জোড়া দেওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের কাঠের গুঁড়ি কিনতে বাড়তি টাকাও খরচ করেছিলেন তিনি। কিন্তু নৌকা তৈরি শেষে বুঝতে পারেন, কিছু কাঠ প্রত্যাশিত মানের ছিল না। পরবর্তীতে নৌকায় দেখা দেয় তেলাপোকার বড় ধরনের উপদ্রবও।

জনের দাবি, নিউজিল্যান্ডের উত্তাল সমুদ্রের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছিল নৌকাটি। তবে এসব শুধুই জনের বক্তব্য। নৌকাটি ঠিক কী কারণে ভেঙে পড়ল, তার প্রকৃত উত্তর পেতে প্রয়োজন আরও তদন্ত ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

পুলিশের তথ্যমতে, পরিবারটি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পোর্ট এন্ট্রি ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর একাধিকবার ভিসার মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পরও তারা দেশেই থেকে যায়। জন নিজেই জানান, দুইবার তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছিল, একবার জরিমানা দিয়েই দেশ ছাড়তে হয়েছিল তাদের। সাধারণত চট্টগ্রাম থেকেই ভিসার মেয়াদ বাড়াতেন তারা। সর্বশেষ ভিসার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২৪ মে। সেই জটিলতা মেটাতেই চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করেছিল আইল্যান্ড গার্ল। যে যাত্রা শেষ হলো নাজিরারটেকের বালুচরে, ভাঙা কাঠের স্তূপ হয়ে।

দুর্ঘটনার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি পরিবারটি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহীদুল আলম জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, খাবারদাবারের ব্যবস্থাও চলছে, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং দেওয়া হচ্ছে পুলিশি নিরাপত্তা।

দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেছে বেলা ও জনের টাকা, ব্যাংকসংক্রান্ত কাগজপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র- যার অনেকটাই এখনো উদ্ধার হয়নি। আইল্যান্ড গার্লের দুই ভাঙা অংশ এখনো পড়ে আছে সৈকতে। সেগুলো বিক্রি করেই পরিবারের জরুরি খরচ চালানোর টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছেন জন।

শ্রীলঙ্কায় নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসকে নিজেদের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন তিনি, তবে প্রত্যাশিত সহায়তা এখনো মেলেনি। এই মুহূর্তে জনের চাওয়া একটাই- তিনি বাংলাদেশেই থাকতে চান, অন্তত যতদিন না ছেলে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেই প্রস্তুতিই এখন নিচ্ছে ভাঙা এক পরিবার।

নিউজিল্যান্ডে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে যে নৌকা যাত্রা শুরু করেছিল বাঁকখালীর তীর থেকে, আজ তার শুধু দুটি টুকরো পড়ে আছে বঙ্গোপসাগরের তীরে- একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank