


মোস্তাক মিয়া। জন্ম কক্সবাজারের উখিয়ায়। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রও আছে। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থায় তিনি একই সঙ্গে আরেক পরিচয়ে পরিচিত হয়ে আছেন, ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় তিনটি রোহিঙ্গা পরিবারকে নিজের বাড়ির উঠানে আশ্রয় দিয়েছিলেন মোস্তাক। তখন ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন চলছিল। ত্রাণ-সহায়তা পাওয়ার আশায় তিনিও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সেই নিবন্ধনের লাইনে দাঁড়ান।
এরপর কেটে গেছে প্রায় নয় বছর। রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ রেশনও নিয়মিত নিয়েছে তার পরিবার। তখন যে সিদ্ধান্তকে জীবিকার সংকটে সাময়িক সহায়তার পথ মনে হয়েছিল, এখন সেটিই তার পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে বড় প্রশাসনিক ফাঁদ।
চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ দিকে পাসপোর্ট করতে গিয়ে মোস্তাকের বড় ছেলে মিজানুর রহমান জানতে পারেন, সরকারি তথ্যভান্ডারে তার দুটি পরিচয়। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। কিন্তু আঙুলের ছাপ মেলাতে গিয়ে একই ব্যক্তি হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজেও। ফলে পাসপোর্টের আবেদনই গ্রহণ করেনি কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।
মিজানুরের বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর, যখন ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছিল। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তিনিও লাইনে দাঁড়িয়ে আঙুলের ছাপ দিয়েছিলেন। দুই বছর আগে পেয়েছেন জাতীয় পরিচয়পত্র। অথচ পাসপোর্ট করতে গিয়ে সেই পুরোনো পরিচয়ই এখন তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিজানুর রহমান বলেন, ‘যখন রোহিঙ্গারা এসেছিল তখন আমার বয়স ছিল ১৪ বছর। পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ক্যাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক করেছিলাম। দুই বছর আগে এনআইডিও পেয়েছি। সে মোতাবেক পাসপোর্ট করতে গিয়েছি। কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে গেলে আমাকে ফিরিয়ে দেয়।’
মিজানুর একা নন। উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় এমন অন্তত এক হাজার বাংলাদেশি নাগরিক এখন একই ধরনের জটিলতায় পড়েছেন। কারও পাসপোর্টের আবেদন আটকে গেছে, কারও ভোটার নিবন্ধন নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে, আবার কেউ বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জানতে পারছেন, রাষ্ট্রীয় নথিতে তার আঙুলের ছাপ রোহিঙ্গা হিসেবেও সংরক্ষিত আছে।
গত জুলাই থেকে বিষয়টি নতুন করে সামনে আসতে শুরু করেছে। কারণ রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্যের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সমন্বয় জোরদার হওয়ার পর আঙুলের ছাপের অমিল বা দ্বৈত পরিচয় সহজেই শনাক্ত হচ্ছে। ফলে প্রায় এক দশক আগে ত্রাণ পাওয়ার আশায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত এখন অনেকের নাগরিক জীবনেই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে দ্রুত আশ্রয়শিবির গড়ে ওঠে। একই সময়ে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে শুরু হয় রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন।
স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি ও ক্যাম্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই সময় উখিয়া ও টেকনাফের কিছু বাংলাদেশি পরিবারও রোহিঙ্গাদের তালিকায় ঢুকে পড়ে। তাদের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের পরিচয় গোপন করে নিবন্ধিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল রেশন ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা পাওয়া।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ কাজে ক্যাম্পের কিছু মাঝি এবং বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি সহযোগিতা করেছিলেন। বিনিময়ে নেওয়া হতো টাকা।
কুতুপালং ক্যাম্প-১-এর একটি সাব-ব্লকের এক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় বাংলাদেশিরা রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধনের আগে মাঝিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তাদের মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকার নাম, গ্রাম, ঠিকানা এমনকি বার্মিজ ভাষা ও মুদ্রা সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হতো।
আরেক মাঝির দাবি, নিবন্ধনের সময় সহযোগিতার জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা নেওয়া হতো। বায়োমেট্রিক সেন্টারে থাকা কিছু সুপারভাইজার ও সহকারীও অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশিদের রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধনে সহায়তা করতেন বলে তার অভিযোগ। অবশ্য এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কুতুপালং লম্বাশিয়া এলাকার বাসিন্দা শহিদ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের ঢলে অনেক স্থানীয় মানুষ জমি, বাগান ও কাজ হারিয়েছিলেন। তাদের বড় একটি অংশ দরিদ্র ছিল। ত্রাণ পাওয়ার আশায় কেউ কেউ রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হন। তখন তারা বুঝতে পারেননি, সেই সিদ্ধান্ত একদিন নাগরিক পরিচয়ের সংকট তৈরি করবে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও থাইংখালী এবং টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, নয়াপাড়া ও বাহারছড়ার শীলখালী এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটেছে।
কুতুপালং লম্বাশিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সেখানে ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাংলাদেশি পরিবারের বসবাস রয়েছে। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ কোনো না কোনো সময় রোহিঙ্গাদের সহায়তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, এসব পরিবারের একটি বড় অংশ রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজে নাম তুলেছিল। তবে এ দাবির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারি কোনো তালিকা দিয়ে যাচাই করা যায়নি।
ক্যাম্পের কয়েকজন মাঝি দাবি করেছেন, জসিম উদ্দিনের পরিবারের চারজন, জয়নাল উদ্দিনের পরিবারের পাঁচজন, মোহাম্মদ রফিকের পরিবারের পাঁচজন এবং ফরিদ আলমের পরিবারের পাঁচজন রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে রেশন নিয়েছেন।
তবে তাদের মধ্যে ফরিদ আলম রেশন কার্ড নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গা ঢলের পর তিনি কোনো সহায়তা পাননি। অন্যদিকে ক্যাম্পের হেড মাঝি আবদুর রশিদ দাবি করেন, উল্লেখিত পরিবারগুলো রোহিঙ্গাদের মতো নিয়মিত রেশন পেয়েছে। তার কাছে এ-সংক্রান্ত তালিকাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, তার ওয়ার্ডেই এমন ২০ থেকে ৩০টি পরিবার রয়েছে, যারা এখন সমস্যায় পড়েছে। তার ভাষ্য, অনেকে ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে নাম তুলেছিলেন। এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে রোহিঙ্গা ডাটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে পাসপোর্টসহ সরকারি বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে তাদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তিনি জানান, এমন কয়েকজনের নাম রোহিঙ্গা ডাটাবেজ থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তিনি সুপারিশ করেছেন।
পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তার ইউনিয়ন থেকে জেলা প্রশাসন ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে পাসপোর্ট করতে গিয়ে যারা আটকে গেছেন, তাদের রোহিঙ্গা ডাটাবেজ থেকে নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গফুর উদ্দিন চৌধুরী আরও বলেন, ত্রাণের লোভে নেওয়া সিদ্ধান্তটি এখন তাঁদের ভবিষ্যতের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পাসপোর্ট নয়, ভোটার নিবন্ধনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবাও ভবিষ্যতে জটিল হয়ে যেতে পারে। ২০১৭ সালে যেসব শিশু রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন প্রাপ্তবয়স্ক। পাসপোর্ট করতে গিয়ে তারা জানতে পারছে, সরকারি ডাটাবেজে তাদের আরেকটি পরিচয় রয়েছে।
এতদিন রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ মূলত ইউএনএইচসিআরের ব্যবস্থাপনায় ছিল। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় সেই তথ্য দেখার সুযোগ পেলেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। পরিস্থিতি বদলেছে নতুন প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের ফলে।
সরকার রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা রেখে নতুন সার্ভার তৈরি করে। চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য বাংলাদেশি সার্ভারে স্থানান্তর শুরু হয়।
নতুন ব্যবস্থায় আঙুলের ছাপের মতো বায়োমেট্রিক তথ্যের মাধ্যমে দুই ডাটাবেজের মধ্যে মিল খোঁজা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে একদিকে বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি বা পাসপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করা রোহিঙ্গারা শনাক্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে রোহিঙ্গা পরিচয়ে আগে নিবন্ধিত বাংলাদেশি নাগরিকরাও ধরা পড়ছেন। অর্থাৎ এতদিন যে দ্বৈত পরিচয় কাগজপত্রের স্তরে লুকিয়ে ছিল, এখন তা আঙুলের ছাপেই সামনে চলে আসছে।
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের তথ্যভান্ডার একীভূত করার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তার ভাষ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের তথ্য রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজে থাকলে আগে সেখান থেকে নাম ও তথ্য বাদ দিতে হবে। এরপরই পাসপোর্টের প্রক্রিয়া এগোবে।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে অনেক আবেদনকারীকে এ কারণে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফলে মিজানুর রহমানের মতো তরুণদের সামনে এখন প্রশ্ন একটাই: নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের পরও কেন আবার প্রমাণ করতে হবে যে তিনি রোহিঙ্গা নন?
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতেই পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু কেউ ত্রাণ পাওয়ার আশায় নিজেকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করে থাকলে সেটি বেআইনি।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রায় এক হাজার আবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে এসেছে। আবেদনকারীদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শুধু প্রশাসনিক যাচাই করলেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ একজন বাংলাদেশির এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, জমির কাগজ কিংবা অন্যান্য সরকারি নথি থাকলেও তার বায়োমেট্রিক তথ্য যদি রোহিঙ্গা ডাটাবেজে থেকে যায়, তাহলে প্রতিটি সরকারি সেবার আগে তাকে সেই তথ্যের ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পাসপোর্ট করতে গিয়ে আটকে পড়া বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য আসছে। প্রথমে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হচ্ছে। এরপর বিষয়গুলো তাদের নজরে আসছে। তবে রোহিঙ্গা ডাটাবেজ থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি সরল কোনো প্রশাসনিক কাজ নয় বলে জানান তিনি।
আমরা সুপারিশ করতে পারি, কিন্তু বাদ দেওয়া একটি গভীর ও জটিল সংকট,’ বলেও মন্তব্য করেন মিজানুর রহমান।
বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বক্তব্যেও সমস্যাটির অস্তিত্বের স্বীকৃতি মিলেছে।
বাংলাদেশে সংস্থাটির যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান গণমাধ্যমে বলেন, ২০১৭ সালের জরুরি পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তথ্য বিনিময়-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকের আওতায় এসব তথ্য ইউএনএইচসিআরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে এসব যাচাই সত্ত্বেও সীমিতসংখ্যক অশরণার্থী ব্যক্তি ভুলবশত নিবন্ধিত হয়েছেন বলে স্বীকার করেছে সংস্থাটি।
শারি নিজমান বলেন, এমন ঘটনা শনাক্ত হলে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য সরকার ও ইউএনএইচসিআরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে সরকার যাদের নিশ্চিত করছে, তাদের রোহিঙ্গা নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান তিনি।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের সময় উখিয়া-টেকনাফে মানবিক বিপর্যয় সামাল দিতে দ্রুততার সঙ্গে তৈরি হয়েছিল বিশাল ত্রাণ ও নিবন্ধন কাঠামো। সেই ব্যবস্থার ফাঁক দিয়ে কিছু বাংলাদেশি নাগরিকও রোহিঙ্গা পরিচয়ে ঢুকে পড়েছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তখন বিষয়টি ছিল রেশন পাওয়ার সুযোগ। এখন সেটিই হয়ে দাঁড়িয়েছে নাগরিক পরিচয়ের সংকট।
একদিকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত বাংলাদেশিরা তাদের ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিবন্ধন বাতিল করতে প্রশাসনের কাছে ছুটছেন। অন্যদিকে সরকারকে নিশ্চিত করতে হচ্ছে, আবেদনকারী সত্যিই বাংলাদেশি নাগরিক কি না। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন এক বাস্তবতা। নিজের দেশের নাগরিক হয়েও কিছু মানুষকে এখন রাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ করতে হচ্ছে, তারা রোহিঙ্গা নন।
মোস্তাক মিয়া ও তার পরিবারের গল্প তাই কেবল একটি পরিবারের ভোগান্তির গল্প নয়। এটি ২০১৭ সালের জরুরি মানবিক ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক ঝুঁকিও সামনে এনেছে।
ত্রাণের একটি রেশন কার্ড দিয়ে যে পরিচয় শুরু হয়েছিল, নয় বছর পর সেটিই কারও কারও পাসপোর্টের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে। আর এখন সেই পরিচয় মুছে ফেলার জন্য শুরু হয়েছে নতুন দৌড়, প্রশাসনের দরজা থেকে ইউএনএইচসিআর, জেলা প্রশাসন থেকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় পর্যন্ত।