

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উপকূলটা যেন এই কয়েক দিন থমথমে ছিল। সাগরে যাওয়া ১৪ জন জেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছেন পরিবারগুলো। শেষ পর্যন্ত তিন দিন পর মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন তারা।
ফিরে আসা জেলেদের অভিযোগ, আটকে থাকার সময় তাদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তাদের ভাষ্য, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে ফেরার পথে হঠাৎ জোয়ারের তীব্র স্রোতে দিক হারিয়ে ফেলেন তারা। একপর্যায়ে না বুঝেই ঢুকে পড়েন নাফ নদীর নাখাইংদিয়া এলাকায়, যা মিয়ানমারের জলসীমার মধ্যে পড়ে।
সেখানেই তাদের পথরোধ করে আরাকান আর্মির সদস্যরা। তিনটি মাছ ধরার নৌকাসহ জেলেদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি ঘাঁটিতে। পরবর্তী তিন দিন কাটে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর দুর্ভোগের মধ্যে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম ঘাটে ভিড়ে তাদের নৌকা।
মাঝেরপাড়া ও ডাঙ্গারপাড়ার বাসিন্দা এই ১৪ জনের মধ্যে আছেন মোস্তাফিজুর রহমান, ফরিদ হোসেন, রাবিউল হাসান, আবুল কালাম, মীর কাসেম আলী, গিয়াস উদ্দিন, সালাউদ্দিন, মহিউদ্দিন, হোসেন আহমেদ, মোল্লা কালু মিয়া, আবু তাহের, আব্দুল খালেক, জাবের মিয়া ও রহিম উল্লাহ।
ফেরার পর সালাউদ্দিন বলেন, আমরা বুঝতেই পারিনি কখন সীমান্ত পার হয়ে গেছি। পরে তারা আমাদের আটক করে এবং মারধর করে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মহিউদ্দিনও। তিনি বলেন, তিন দিন অনেক কষ্টে ছিলাম। কখন ছাড়বে, সেই অপেক্ষায় ছিলাম।
জেলেদের পরিবারগুলোও এই তিন দিন পার করেছেন চরম উৎকণ্ঠায়। গিয়াস উদ্দিন, সালাউদ্দিন ও মহিউদ্দিনের মা রাশিদা বেগম বলেন, প্রতিদিন শুধু দোয়া করেছি। আল্লাহর কাছে চেয়েছি ওরা যেন বেঁচে ফিরে আসে।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, শুরু থেকেই বিষয়টি তাদের নজরে ছিল। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জেলেদের ফেরানো সম্ভব হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল হাফিজ নাদিম জানান, সীমান্ত এলাকায় এমন ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যায়, সে জন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং জেলেদের নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে।
স্থানীয় জেলে সংগঠন ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে ৪০০ জনের বেশি জেলে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জন দেশে ফিরেছেন।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ৭৩ জন জেলে একযোগে ফিরে আসেন। বিজিবির প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সময়ে ১৮৯ জন জেলে ও ২৭টি ট্রলার উদ্ধার করা গেলেও এখনো রাখাইন রাজ্যে অন্তত ১৭২ জন জেলে ও ৩২টি ট্রলার আটকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাই শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি উঠছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তাদের কথায়, জীবিকার তাগিদে সাগরে যেতে হয়, কিন্তু প্রতিবারই থাকে জীবন নিয়ে ফেরার অনিশ্চয়তা।
মন্তব্য করুন