শুক্রবার
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতি ও অনিয়মের মহোৎসব

উখিয়া-টেকনাফ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস
expand
উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিস

সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে লাগামহীন দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দলিল নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাকে ঘিরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ইচ্ছাকৃত সময়ক্ষেপণ এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে অফিসটি কার্যত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকা সত্ত্বেও প্রবেশপথে ‘বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। এতে করে দলিল নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগের তীর মূলত অফিস সহকারী বেবী রাণী দে, তার গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের সদস্য মোহরার সৃদুল দাশ ও রবিউল্লাহ রবি-এর দিকে। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলম অফিসে অনিয়মিত উপস্থিত থাকা, নির্দিষ্ট সময়ের আগে অফিসে না আসা এবং নিজের কক্ষে প্রবেশে অনুমতির মতো আচরণ করে অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোপন সূত্রে জানা গেছে, দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে জমির মূল্যের ০.৫ শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে আদায় করেন অফিস সহকারী বেবী রাণী দে। ফলে ১ কোটি টাকার জমি নিবন্ধনে দিতে হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা ঘুষ।

এছাড়াও ‘কমিশন’, ‘অফিস খরচ’সহ বিভিন্ন অজুহাতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি অদৃশ্য ফি আদায় ব্যবস্থা, যা পুরো অফিস কার্যক্রমকে জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

একাধিক সূত্র জানায়, আদায়কৃত ঘুষের ২৫ শতাংশ বেবী রাণী দে নিজে রাখেন এবং বাকি ৭৫ শতাংশ সিন্ডিকেটের সদস্য ও দালালদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। দলিল লেখকদের মাধ্যমেই এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও বাজারমূল্য ইচ্ছেমতো কম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। এতে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বেবী রাণী দে, সৃদুল দাশ, রবিউল্লাহ রবি এবং সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে।

দলিলের টিপসই নেওয়া, রশিদ লেখা, মোহরা ও কোর্ট ফি আদায়ের প্রতিটি ধাপেই নির্দিষ্ট হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রতি কাগজে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বর্তমানে প্রায় ২০ জন দলিল লেখক রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, দু-একজন ছাড়া বাকিদের পুরোপুরি জিম্মি করে রাখা হয়েছে। অফিসের ‘চাহিদা’ পূরণ না হলে তাদের ‘গেট পাস’ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এমনকি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা বা তথ্য সরবরাহ করাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কয়েকজন দলিল লেখককে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে অফিসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক গোলসান আনোয়ার-এর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযান চালিয়ে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রমাণ পায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অফিসের এক কর্মচারী জানান, দুদক আসার খবর পেয়ে সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোরশেদ আলম সেদিন সকাল ৯টার আগেই অফিসে উপস্থিত হন এবং ড্রয়ারে থাকা প্রায় ৩ লাখ টাকা ঘুষ কৌশলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন। এরপরও দুদক অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

অফিস সহকারী বেবী রাণী দে-কে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মোহরার সৃদুল দাশের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। রবিউল্লাহ রবি বলেন, “এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”

সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তা মোঃ মোরশেদ আলম বলেন, “অফিসে প্রবেশে কোনো অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে খাস কামরায় প্রবেশের জন্য অনুমতি লাগে, কারণ এটি অফিসারের ব্যক্তিগত কাজের স্থান। আমার অফিস সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত। এখানে অবৈধ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো সত্য নয়। কারও অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে দিতে পারেন।”

সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও উখিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে এখনো স্বৈরাচারী মানসিকতা ও দুর্নীতির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। দুর্নীতি যদি এতটাই ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়, তবে প্রশাসনের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

তাদের দাবি, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভেঙে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

X