

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


গ্রামের এক কোণে ডোবার ওপর বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি চালা। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, হয়তো হাঁস-মুরগি পালন করা হয় সেখানে। কিন্তু কাছে গেলেই ভেসে ওঠে এক নির্মম বাস্তবতা। সেই ছোট্ট চালাতেই বসবাস করছেন আশির্ধো এক বৃদ্ধ—কৈলাশ। জীবনের দীর্ঘ পথ একাই পাড়ি দেওয়া এই মানুষটি আজ বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে এসে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
চিরকুমার এই বৃদ্ধ সম্পর্কে জানা যায়, চল্লিশ-এর দশকের কোনো এক সময় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের কবলে পড়ে চিলমারীর চলনার ভিটা থেকে কৈলাশ চলে আসেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের তারাপুর ইউনিয়নের ঘগোয়া গ্রামের বড় বোন সিন্ধু বালার বাড়িতে। যৌবনে বোনের সংসারে বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও বিয়ে করেননি তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাটা পড়েছে যৌবনে। হারিয়ে ফেলেছেন কর্মক্ষমতা। কমে গেছে শ্রবণশক্তি ও কথা বলার ক্ষমতা। নিজের নেই কোনো জমিজমা, নেই স্থায়ী আয়ের উৎস। বেঁচে নেই বোন সিন্ধু বালা ও দুলাভাই বিপিনও। আজ বড্ড একা কৈলাশ।
তাই তো এখন ডোবার ওপর ছোট্ট একটি অস্থায়ী চালাই হয়েছে তাঁর একমাত্র আশ্রয়। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি আর ঝড়ো হাওয়ায় ঘরটি প্রায়ই ঝুঁকির মুখে পড়ে। চালাটি মজা ডোবার ওপর হওয়ায় মশা হয়েছে নিত্য সঙ্গী। নিত্যদিনের খাবার জোটে প্রতিবেশীদের সহায়তায়। চিকিৎসার অভাবে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও নিয়মিত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নেই তাঁর।
হরিপদ বর্মন নামের এক প্রতিবেশী জানান, সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁরা মাঝে মধ্যে খাবার ও প্রয়োজনীয় কিছু সহায়তা করেন। তবে তা দিয়ে স্থায়ীভাবে একজন অসহায় বৃদ্ধের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার দাবি, সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে কৈলাশের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি।
গবাদিপশুর পল্লী চিকিৎসক রাহুল বলেন, যৌবনকালে কৈলাশকে বিভিন্নভাবে খাটিয়ে নিয়েছেন অনেকেই। তাছাড়া, যাদের বাড়িতে তিনি ছিলেন তারাও তাকে খাটিয়েছেন। কিন্তু তার যে একজন জীবনসঙ্গী দরকার সেটার কোনো উদ্যোগ নেননি তারা। যার ফলে আজ তার এই করুন পরিণতি।
বাস্তবে, কৈলাশের জীবন যেন বার্ধক্যে একাকীত্ব ও অসহায়তার এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। যদিও তাঁর বর্তমান অবস্থার পেছনে শুধু বিয়ে না করাই একমাত্র কারণ—তা বলা যায় না; বরং দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, বার্ধক্য এবং পারিবারিক সহায়তার অনুপস্থিতিও তাঁর এই দুর্দশার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
চিরকুমার এই বৃদ্ধের জন্য মানবিক পরিবেশে বসবাসের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না- জানতেে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে প্রথম জানলাম। এ বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের বিত্তবান মানুষ এগিয়ে এলে জীবনের শেষ সময়ে অন্তত নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবেন এই অসহায় বৃদ্ধ এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
