বুধবার
০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যমুনায় ভাসছে জীবনের ঠিকানা

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
টানা নদীভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি
expand
টানা নদীভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি

যমুনা এবার শুধু নদী নয়, যেন এক নির্মম গ্রাসকারী। প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে মানুষের ভিটেমাটি, ফসলি জমি, মসজিদ, স্কুল, কবরস্থান, আর বহু বছরের সাজানো সংসার। নদীর গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ।

সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার নদীতীরবর্তী জনপদে এখন একটাই আতঙ্ক, সকালে যে ঘর আছে, রাত পোহাতে সেটি থাকবে তো?

গত দুই সপ্তাহের টানা নদীভাঙনে শতাধিক বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা এবং শত শত বিঘা আবাদি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে। হাজারো পরিবার নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে, কখন নদী তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয় সেই আশঙ্কায়।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে। একসময় ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারের কোলাহলে মুখর এই চর এখন ভাঙনের ক্ষতচিহ্নে বিদীর্ণ। মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে আরও শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়বে।

একই চিত্র চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে ৪০ থেকে ৫০টি বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল ও দোকানপাট নদীতে হারিয়ে গেছে। কৃষকের বছরের পর বছর ঘাম ঝরিয়ে গড়ে তোলা শত শত বিঘা ফসলি জমিও মুহূর্তেই বিলীন হচ্ছে।

২০ জুন বিকেলে সদর উপজেলার বাহুকা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ নদীতে ধসে পড়ে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেললেও স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে।

ভাঙনের শিকার মানুষদের অনেকেই এখন আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন। হারিয়ে গেছে শুধু ঘর নয়, শেকড়, স্মৃতি, পূর্বপুরুষের কবর আর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন কৃষিজমিও।

চরগিরিশ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বাবা-দাদার ভিটায় জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যেই সব যমুনা নিয়ে গেল। এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছি।

রফিকুল ইসলাম বলেন, চোখের সামনে সব নদীতে চলে গেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কী খাব, সেটাই জানি না।

চরসলিমাবাদের কোহিনুর খাতুন বলেন, আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। সরকারি সহায়তা না পেলে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হবে।

রেজাউল করিম বলেন, নদী শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি, আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। নিজের দেশেই আমরা উদ্বাস্তু হয়ে গেছি। পূর্বপুরুষদের কবর আর মসজিদও নদীতে হারিয়ে গেছে। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

ষাটোর্ধ্ব রশিদ মিয়ার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘশ্বাস, এত কষ্ট করেছি জীবনে, কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। এখন কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হলেও তা অধিকাংশ জায়গায় নদীর আগ্রাসন ঠেকাতে পারছে না। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় টেকসই তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এই দুর্ভোগের শেষ হবে না।

চরগিরিশ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, আগে প্রায় ১৫০টি পরিবার ভাঙনের কারণে এলাকা ছেড়েছে। গত দুই সপ্তাহে আরও অন্তত ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারাবে।

পানি বৃদ্ধির কারণে নদীতীরবর্তী অনেক এলাকায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচলও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আমিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরোধে কাজ করছে।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, সদর, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালীর কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

যমুনা শুধু মাটি ভাঙছে না। প্রতিদিন ভেঙে দিচ্ছে মানুষের আশ্রয়, স্মৃতি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই আর্তনাদ, ত্রাণ নয়, চাই স্থায়ী সমাধান। কারণ, আর কোনো সন্তান যেন নিজের চোখের সামনে বাবার গড়া বাড়ি নদীতে তলিয়ে যেতে না দেখে, আর কোনো বৃদ্ধ যেন পূর্বপুরুষের কবর হারিয়ে নির্বাক হয়ে না দাঁড়ায়।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
England VS Congo DR
Scheduled
01 Jul, 10:00 PM
VS
World Cup