বুধবার
১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১৭ জুন ২০২৬, ৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বকাপের পতাকা সেলাই করেই ৩০ বছর  

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
মো. সোহেল
expand
মো. সোহেল

বিভিন্ন রঙের কাপড়ের স্তূপ, রঙিন সুতা, কাঁচি আর সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ। নারায়ণগঞ্জ নগরীর কালীরবাজার স্টেশন মার্কেটের সামনে ছোট্ট একটি কর্মস্থলেই কেটে যায় মো. সোহেলের বেশির ভাগ সময়। বয়স এখন ৫০। কিন্তু পতাকা তৈরির সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রায় ৩৫ বছরের।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই পেশায় হাতেখড়ি হয়েছিল তার। এরপর থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কিংবা বিভিন্ন উপলক্ষে দেশ-বিদেশের পতাকা বানিয়েই চলছে তার সংসার।

সোহেল বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে পতাকা সেলাই করছি। বাংলাদেশের পতাকা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা বানাই। যে দেশগুলোর খেলা হয়, প্রায় সব দেশের পতাকাই তৈরি করি।”

বিশ্বকাপ এলেই সাধারণত তার ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার। সোহেলের দোকানে বিভিন্ন আকারের পতাকা তৈরি হয়। কারও প্রয়োজন বাড়ির বারান্দার জন্য, আবার কেউ কিনে রাস্তার মোড় বা বড় কোনো স্থাপনায় টানানোর জন্য।

তিনি জানান, পতাকার দাম শুরু হয় ৫০ টাকা থেকে। এরপর ১০০, ২০০, ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে বড় আকারের পতাকার দাম কয়েক হাজার টাকাও হয়।

“৩ হাজার, ৪ হাজার, ৫ হাজার, এমনকি ১০-১২ হাজার টাকার পতাকাও বিক্রি হয়,” বলেন তিনি। চাহিদার তালিকায় বড় আকারের পতাকাও কম নয়। ৬ ফুট, ১২ ফুট, ১৫ ফুট, ২০ ফুট থেকে শুরু করে ৩০ ফুট পর্যন্ত পতাকা তৈরি করেন তিনি।

বন্দর উপজেলার বাসিন্দা সোহেল (৫০) স্ত্রী ও দুই পুত্র সন্তানকে নিয়ে সেখানে বসবাস করেন। তবে এবারের বাজার নিয়ে আশাবাদী নন সোহেল। পতাকা বিক্রেতা বলেন, আগের তুলনায় বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর কারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা-সব মিলিয়ে কমেছে ফুটবল বিশ্বকাপ উৎসবের আমেজ।

“মানুষের ভিতরে এখন সেই আনন্দ নেই। দেশের পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো না। যুদ্ধের প্রভাব আছে। আবার আমাদের ফুটপাতের দোকানও ভেঙে ফেলা হয়েছে। অনেক পুরোনো কাস্টমার হারিয়ে গেছে,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে বিশ্বকাপের মৌসুম একসময় সোহেলের জন্য ছিল বাড়তি আয়ের সুযোগ। কয়েক মাসের বিক্রিতেই বছরের ভালো একটা অংশের আয় উঠে আসত। তিনি বলেন, “গত বছরও শুধু পতাকার ব্যবসা থেকে দেড়-দুই লাখ টাকা লাভ করেছি। তার আগের বছরও একই রকম হয়েছে।”

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন দাবি করে তিনি বলেন, “এবার ৫০ হাজার টাকা লাভ করতে পারব কি না, সেই সন্দেহ আছে।” বর্তমানে দৈনিক আয় কখনো এক হাজার, কখনো দুই বা তিন হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে জানান তিনি।

বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সোহেল নিজেকে সেই বিতর্কের বাইরে রাখেন। হেসে তিনি বলেন, “আমি সব দলের। কেউ যদি বলে আর্জেন্টিনা, আমি আর্জেন্টিনা। কেউ যদি বলে ব্রাজিল, আমি ব্রাজিল। আমি কারও মন খারাপ করতে চাই না।”

তবে ব্যক্তিগতভাবে একটি দলকে সমর্থন করলেও সেটি প্রকাশ করতে রাজি নন তিনি। অদ্ভুত হলেও সত্যি, যিনি বছরের পর বছর বিশ্বকাপের পতাকা বানিয়ে সংসার চালান, তার নিজেরই খেলা দেখার সুযোগ খুব কম।

সোহেল বলেন, “কাজের ব্যস্ততায় খেলা দেখার সময় পাই না। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা বসে খেলা দেখার সুযোগ হয় না। শেষে কে গোল করল, ফলাফল কী হলো, সেটা দেখে নেই।”

প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতার সমায়ও সেলাই মেশিনে তখনও চলছিল নতুন একটি পতাকার কাজ। হয়তো সেটি কোনো আর্জেন্টিনা সমর্থকের জন্য। কিন্তু পতাকার রং যাই হোক, সোহেলের আশা একটাই—মানুষের জীবনে আবার ফিরুক সেই উৎসবের আনন্দ, যেটির ওপর নির্ভর করে তার মতো অসংখ্য কারিগরের জীবিকা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
UPCOMING
Portugal VS Congo DR
Scheduled
17 Jun, 11:00 PM
VS
World Cup