রবিবার
১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাদকের আখড়া

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাদকের চিত্র
expand
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাদকের চিত্র

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন টাঙ্গাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে এখানে আসেন। তবে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালটির পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি হাসপাতালের নতুন ভবনের ১৪ তলায় মাদকসেবীদের আড্ডা ও মাদক সেবনের অভিযোগ সামনে আসায় রোগী ও স্বজনদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের নতুন ভবনের ১৪ তলার কিছু নির্জন স্থানে নিয়মিতভাবে একদল ব্যক্তি জড়ো হয়ে মাদক সেবন করে। দিনের বেলায় তুলনামূলক কম দেখা গেলেও সন্ধ্যা ও রাতের দিকে সেখানে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের উপস্থিতি বাড়ে। অনেক সময় সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, পানির বোতল, প্লাস্টিকের কাপ ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্বজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোগীর স্বজন বলেন, হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় রোগী দেখতে যাওয়া-আসার সময় কিছু যুবককে আড্ডা দিতে দেখা যায়। তাদের আচরণ অনেক সময় অস্বাভাবিক মনে হয়। হাসপাতালের মতো জায়গায় এমন পরিবেশ খুবই উদ্বেগজনক।

আরেক স্বজন বলেন, রাতে রোগীর পাশে থাকতে হয়। তখন হাসপাতালের কিছু অংশে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করি। প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার।

শুধু মাদকের অভিযোগই নয়, হাসপাতালের ভেতরে পরিচ্ছন্নতা নিয়েও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সামনে, সিঁড়ির কোণায়, করিডোরে এবং ভবনের বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রোগীদের। কোথাও কোথাও ব্যবহৃত খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল, পানির কাপ এবং অন্যান্য বর্জ্য দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়ায়।

হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে অনেক সময় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়া যায় না। করিডোরে ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কয়েকজন রোগী অভিযোগ করেন, কিছু ওয়ার্ডে শৌচাগারের পরিবেশও সন্তোষজনক নয়। পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা না থাকায় রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষেরা এ সমস্যায় বেশি পড়েন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, রোগীর চাপের কারণে শয্যা সংকট, করিডোরে রোগী রেখে চিকিৎসা দেওয়া, অপর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়ও। অনেক রোগী বলেন, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে এলেও সেই তুলনায় সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি।

একজন বৃদ্ধ রোগীর ছেলে বলেন, ডাক্তাররা চেষ্টা করেন, কিন্তু রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে সবাইকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

আরেকজন বলেন, “হাসপাতালের পরিবেশ আরও উন্নত করা দরকার। রোগীরা এমনিতেই অসুস্থ অবস্থায় থাকে, তার ওপর যদি নোংরা পরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতা থাকে তাহলে কষ্ট আরও বেড়ে যায়।”

স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু জেলার নয়, বৃহত্তর অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। তাই হাসপাতালের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তারা বলেন, হাসপাতালের ভেতরে মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলোও দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।

সচেতন মহল মনে করে, হাসপাতালের বিভিন্ন তলায় নিয়মিত নিরাপত্তা টহল, সিসিটিভি ক্যামেরার কার্যকর ব্যবহার এবং দর্শনার্থীদের চলাচলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ থাকলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, হাসপাতালের ১৪ তলায় মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ অস্বীকার করার মতো না । তবে এ ধরনের কোনো ঘটনা আমাদের চোখের আড়ালে হয়ে থাকে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে। হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে । পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান উন্নয়নের জন্যও হাসপাতাল প্রশাসন কাজ করছে।

হাসপাতালে দায়িত্বরত পুলিশ বক্সের এএসআই হানিফ বলেন, হাসপাতাল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছে। মাদক সেবনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কয়েকজনকে সাজাও দেওয়া হয়েছে। কিছু লােকাল লোকজন এই নেশার কার্যক্রম করে থাকে । হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। অনেকের জন্য এটি উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার শেষ ভরসা। কিন্তু হাসপাতালের ভেতরে মাদকসেবীদের আনাগোনার অভিযোগ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, শৌচাগারের দুরবস্থা এবং বিভিন্ন সেবাগত সীমাবদ্ধতা রোগী ও স্বজনদের হতাশ করছে।

রোগী ও স্বজনদের দাবি, হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে নয়, একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও মানবিক পরিবেশসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য মাদকবিরোধী কঠোর নজরদারি, নিরাপত্তা জোরদার, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বৃদ্ধি, রোগীবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

তাদের প্রত্যাশা, টাঙ্গাইল-৫ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও মৎস ও প্রাণী সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু যেহেতু সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছে সেক্ষেত্রে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আবারও রোগীদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে এবং চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি একটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
FIFA World Cup
LIVE
Germany VS Curaçao
Scheduled
Germany
- - -
Curaçao
World Cup