

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


মানবাধিকার সংগঠনের নাম ব্যবহার করে অসহায় নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল ও পর্নোগ্রাফি চক্র পরিচালনার অভিযোগে কথিত মানবাধিকার নেতা নুরুল ইসলাম ওরফে নুরুল হককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-৯।
দীর্ঘদিন ধরে বাহুবল ও চুনারুঘাট এলাকায় ‘মানবাধিকার’ ও ‘এনজিও কার্যক্রমের’ আড়ালে এই ভয়াবহ অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
রোববার (৮ মার্চ) সন্ধ্যায় র্যাব-৯ এর শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের একটি আভিযানিক দল চুনারুঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারকৃত নুরুল হক বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের লাকুড়ীপাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে। তিনি নিজেকে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা’র সিলেট বিভাগীয় সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ‘দরিদ্র কল্যাণ সংস্থা’ ও ‘মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা’ নাম ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অনৈতিক চক্র পরিচালনা করছিলেন নুরুল হক। দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের কিশোরী, তরুণী এবং স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তিনি তাদের ফাঁদে ফেলতেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় তিনি ভুক্তভোগীদের ধর্ষণ করে সেই দৃশ্য গোপনে ভিডিও ধারণ করতেন। পরে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাকমেইল করা হতো।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, চুনারুঘাট উপজেলার এক তরুণী প্রায় এক বছর আগে নুরুল হকের প্রতিষ্ঠানে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে কুপ্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মহাশয়ের বাজারে তার কার্যালয়ের ভেতরেই প্রথমবার ওই তরুণীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ধর্ষণের সময় মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে প্রায় পাঁচ মাস ধরে তাকে জিম্মি করে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়।
তরুণীর আরও অভিযোগ, তাকে অচেতনকারী ওষুধ খাইয়ে নুরুল হকের সহযোগী ও বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের কাছেও পাঠানো হতো।
সম্প্রতি তিনি চাকরি ছেড়ে দিলে সেই আপত্তিকর ভিডিও বিদেশে পাঠানো হয়, যা পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন নারী কর্মী একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
চুনারুঘাট ও বাহুবলের অন্তত আরও দুই তরুণী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন। সামাজিক লোকলজ্জা ও প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে এতদিন তারা প্রকাশ্যে আসেননি।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাশিদা নামে এক শিক্ষার্থী হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন।
নুরুল হক নিজেকে কখনো এনজিও কর্মকর্তা, কখনো মানবাধিকার নেতা, আবার কখনো গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাতাশর এলাকায় অফিস স্থাপন করে তিনি তার কার্যক্রম শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে দেখা যায় ১৬ বছরের এক কিশোরীকে লন্ডনে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে নুরুল হক যৌন হয়রানি করছেন।
ভিডিওতে তাকে ইমো অ্যাপের মাধ্যমে এক প্রবাসীর সাথে ওই কিশোরীকে আপত্তিকর কথোপকথনে বাধ্য করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় বাহুবল মডেল থানায় চার তরুণী মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত নুরুল হকসহ ওসমানীনগরের আবুল বশর (মামুন বখত) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২ এর সংশ্লিষ্ট ধারায় দায়ের করা হয়েছে।
র্যাব-৯, সিপিসি-৩ শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি মামলার প্রধান অভিযুক্ত নুরুল হককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তিনি মানবাধিকার সংস্থার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে অসহায় নারীদের ব্ল্যাকমেইল করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাহুবল মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হবে।
মন্তব্য করুন