

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


সম্প্রতি রাজবাড়ী জেলায় কুকুর, বিড়াল ও ইঁদুরে কামড়ানো রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও গত প্রায় এক মাস ধরে সদর হাসপাতালসহ কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না জীবনরক্ষাকারী র্যাবিস ভ্যাকসিন।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল বা উপজেলা হাসপাতালগুলোতেই নয়, জেলার অধিকাংশ ওষুধ ফার্মেসিতেও এই ভ্যাকসিনের কোনো সন্ধান মিলছে না। ফলে চিকিৎসা না পেয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে ভ্যাকসিনের আশায় প্রতিদিন গড়ে এক থেকে শতাধিক রোগী রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও টিকা না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এই সুযোগে একটি অসাধু চক্র রোগীদের জিম্মি করে দ্বিগুণ দামে ভ্যাকসিন বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দ্রুত ভ্যাকসিনের সরবরাহ নিশ্চিত করে রোগীদের ভোগান্তি ও আতঙ্ক দূর করার দাবি জানিয়েছেন রোগীর স্বজনরা।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ভ্যাকসিন সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে আগামী এক মাসের মধ্যেও নতুন করে ভ্যাকসিন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে রোগীরা নিজেরা ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে আনলে তা পুশ করে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। একইভাবে দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালসহ ওষুধ ফার্মেসিগুলোতেও পাওয়া যাচ্ছে না এই ভ্যাকসিন। তবে সরকারি মূল্যে ৫০০ টাকার ভ্যাকসিন একটি অসাধু চক্রের মাধ্যমে ১,০০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভেতরেই এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যদিও বিষয়টি সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবগত নয় বলে দাবি করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিকা না পেয়ে শিশু, নারী ও পুরুষ রোগীরা রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের র্যাবিস টিকাদান কক্ষের সামনে ভিড় করে হট্টগোল করছেন। কক্ষের ভেতরে চেয়ার-টেবিলে বসে আছেন সেবিকারা। এ সময় কেউ কেউ নিজেরাই ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে এনে সেবিকাদের মাধ্যমে শরীরে পুশ করাচ্ছেন। আবার অনেকেই টাকা হাতে নিয়ে ভ্যাকসিনের খোঁজ করছেন এবং না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়ায় অনেক রোগী আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।
রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার প্রায় ১৫ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই সদর হাসপাতাল। ১০০ শয্যার হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ভবন নির্মাণের কাজ চললেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি চিকিৎসক, ওষুধ ও ভ্যাকসিন সংকটে জর্জরিত। সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীদের ফরিদপুর বা ঢাকায় রেফার করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
রোগীর স্বজন বিথি বিশ্বাস বলেন, “আমার মেয়েকে ভ্যাকসিন দিতে হাসপাতালে এনেছিলাম। তারা বলছে ভ্যাকসিন নেই। এর আগেও ১২০ টাকা করে দুইবার কিনে দিয়েছি। কিন্তু আজ একজন মহিলা ৫০০ টাকা চেয়েছে। চারজনের জন্য একটি ভ্যাকসিনে ২,০০০ টাকা দাবি করেছে। আমরা রাজি হইনি। কিন্তু ভ্যাকসিন না পেলে কী করব বুঝতে পারছি না।”
মাহফুজা নামের আরেক রোগী বলেন, “আমি সকাল থেকে ভ্যাকসিনের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। হাসপাতালে ভ্যাকসিন নেই। হঠাৎ এক মহিলা এসে বললেন, একজনের কাছ থেকে ভ্যাকসিন কিনে নিতে পারবেন। আমাকে নিচতলায় নিয়ে গিয়ে একজন বললেন, দূর থেকে ভ্যাকসিন এনেছেন এবং চারজনের জন্য ২,০০০ টাকা লাগবে। ৫০০ টাকা বললে তিনি বলেন ভ্যাকসিন নেই। এভাবেই আমাদের জিম্মি করে বেশি দামে ভ্যাকসিন বিক্রি করছে।”
আরেক রোগীর স্বজন সাজেদা বেগম বলেন, “আমার মেয়েকে বিড়ালে কামড় দিয়েছে। দুই ডোজ ১২০ টাকা করে নিয়েছি। এখন ৫০০ টাকা চাচ্ছে। গতকাল ১২০ টাকা নিয়ে আসায় ভ্যাকসিন না পেয়ে ফিরে গেছি। আজ আবার এসেছি। একজন ২০০ টাকা চেয়েছিল, কিন্তু ভ্যাকসিন আগে দিতে বললে চলে যায়। আজও ভ্যাকসিন না নিয়েই ফিরতে হবে।”
মিলন মিয়া বলেন, “আমার ছেলেকে কুকুরে কামড়েছে। হাসপাতালে ভ্যাকসিন নেই। তবে এখানেই ৫০০ টাকার ভ্যাকসিন ১,০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এত টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার সামর্থ্য আমার নেই। সরকারি ভাবে ভ্যাকসিন থাকলে আমাদের মতো গরিব মানুষের এত কষ্ট হতো না।”
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের র্যাবিস টিকাদান কেন্দ্রের ইনচার্জ শিরিনা খাতুন বলেন, “বর্তমানে ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। যারা গ্রুপ করে ভ্যাকসিন কিনে নিয়ে আসছেন, তাদের আমরা পুশ করে দিচ্ছি। শুনেছি রুমের বাইরে কেউ কেউ বেশি দামে বিক্রি করছে। আমি কাউকে চিনি না। তবে নজরদারি করছি। কিছু পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবো।”
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ হান্নান বলেন, “গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিন নেই। বিষয়টি ঢাকায় জানানো হয়েছে। তারা এক মাস পর যোগাযোগ করতে বলেছে। সে হিসেবে আশা করছি এক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। বর্তমানে বাজারেও ভ্যাকসিন নেই। অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিষয়ে আমার জানা নেই এবং হাসপাতালের কেউ এতে জড়িত নয়। যারা টিকা দেন তারা শুধু পরামর্শ দেন। চারজন মিলে একটি গ্রুপ করে ভ্যাকসিন কিনে আনলে তা মাংসপেশীতে পুশ করে দেওয়া হয়।”
মন্তব্য করুন
