

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


ব্রাজিলের তরুণ সমাজের এক বড় অংশ এখন মানসিক হতাশা ও মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, দেশটির তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও অবৈধ মাদক, বিশেষ করে গাঁজা ব্যবহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গবেষকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং মাদকের সহজলভ্যতা এই প্রবণতার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
ব্রাজিলের ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অ্যালকোহল সেবন করেছেন। অন্যদিকে প্রায় ৩০ শতাংশ অন্তত একবার অবৈধ মাদক ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কোকেন ব্যবহার করেছেন প্রায় ১০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, গত এক বছরে ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ অ্যালকোহল সেবন করেছেন। একই সময়ে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ গাঁজা, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কোকেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ অন্যান্য মাদকও ব্যবহার করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি। গত মার্চে ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রির প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশটিতে বিষণ্নতা নিরাময়ে ওষুধের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের হার প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার বৈষম্যের কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।
আন্তর্জাতিক ক্যানাবিস বিজনেস কনফারেন্স-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জীবনে অন্তত একবার গাঁজা ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় এক কোটি মানুষ নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন, যার বড় অংশই তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
গবেষকদের মতে, গাঁজার সহজলভ্যতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আইনি শিথিলতা। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সীমিত পরিমাণ গাঁজা রাখাকে ফৌজদারি অপরাধের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর থেকে মাদকটি তরুণদের কাছে আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে।
ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর অ্যালকোহল অ্যান্ড ড্রাগ রিসার্চ ইউনিটের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি সাতজন ব্রাজিলিয়ানের মধ্যে একজন ইতোমধ্যে গাঁজা সেবন করেছেন। ২০২৩ সালে প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গাঁজা ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন, যা প্রায় এক কোটি মানুষের সমান।
১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ বয়সী প্রায় ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে গাঁজা সেবন করেছেন এবং ১৩ দশমিক ২ শতাংশ নিয়মিত ব্যবহারকারী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিকিৎসা-বঞ্চিত তরুণদের অনেকেই একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু বাস্তবে এসব মাদক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিষণ্নতা ও গাঁজা ব্যবহারের মধ্যে একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক রয়েছে। হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অনেক তরুণ গাঁজা সেবন শুরু করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে হতাশা, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কৈশোরে গাঁজা ব্যবহার শুরু করলে পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোটিক ডিসঅর্ডার ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সে গাঁজা ব্যবহারকারীদের মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
ব্রাজিলিয়ান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক তরুণ মাদককে মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে ব্যবহার করছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাস্তব জীবনধারার চাপ তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব ও হতাশা বাড়িয়ে তুলছে।
