


৩৭ বছর বয়সে এসে স্ত্রী খোঁজার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন চীনের হেবেই প্রদেশের বাসিন্দা ওয়াং ঝুয়াং। এর মধ্যেই নজরে আসে আকর্ষণীয় কিছু বিয়ের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছিল, জীবনসঙ্গী খুঁজতে বছরের পর বছর সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজন নেই। কয়েক দিনের মধ্যেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে শান্ত, সংসারী ও স্বামীনিষ্ঠ নারীর সঙ্গে। দ্রুত বিয়ে সমাধানও দ্রুত।
এই আশ্বাসেই গুইঝৌ প্রদেশের গুইয়াং শহরে যান ওয়াং। ম্যাচমেকারদের কথায় তার ধারণা হয়েছিল, এখানকার মেয়েরা সংসারী, মিতব্যয়ী এবং পরিবারকেন্দ্রিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশাই তার জীবনের বড় আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিয়ের আগে মাত্র কয়েকবার দেখা হয়েছিল ওই নারীর সঙ্গে। ওয়াংয়ের চোখে তিনি ছিলেন শান্ত, সাধারণ পোশাক পরা এবং সৎ স্বভাবের একজন নারী। অথচ বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক তথ্য সামনে আসতে থাকে। ঋণ আদায়কারীরা ফোন করতে শুরু করেন। স্ত্রীর ফোন পরীক্ষা করে ওয়াং জানতে পারেন, তার অতীত সম্পর্কে দেয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের মিল নেই।
ওয়াংয়ের দাবি, ওই নারী আগে কারাওকে প্রতিষ্ঠানে হোস্টেস হিসেবে কাজ করতেন, এর আগে তিনবার বিয়ে হয়েছিল, তার তিনটি সন্তান ছিল এবং তিনি ঋণে ডুবে ছিলেন। এমনকি নিজের বয়স সম্পর্কেও তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।
এরপর শুরু হয় বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা। কিন্তু স্ত্রী কনেপণের কোনো অর্থ ফেরত দিতে রাজি হননি। যে ম্যাচমেকিং এজেন্সির মাধ্যমে বিয়ে হয়েছিল, সেটির অফিসে গিয়ে ওয়াং দেখেন প্রতিষ্ঠানটি গুটিয়ে উধাও হয়ে গেছে। তার দাবি, জীবনের সঞ্চয় থেকে বিপুল অর্থ তিনি ওই প্রক্রিয়ায় খরচ করেছিলেন।
ওয়াং বলেন, আমার বাবা-মা এর জন্য আমাকেই দায়ী করছেন। আমি অনিদ্রা ও উদ্বেগে ভুগছি। কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না।
ওয়াংয়ের ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের পেছনে অবশ্য শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা নয়, রয়েছে চীনের দীর্ঘদিনের জনমিতিক সংকটও। কয়েক দশক ধরে চলা এক সন্তান নীতি এবং ছেলে সন্তানকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতার কারণে দেশটিতে নারী-পুরুষের সংখ্যায় বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে পুরুষের সংখ্যা নারীর চেয়ে প্রায় তিন কোটি বেশি।
এই পরিস্থিতিতে ছোট শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পুরুষের জন্য বিয়ে করা কঠিন হয়ে উঠেছে। জীবনসঙ্গী খুঁজতে তাদের গাড়ি, বাড়ি কিংবা পারিবারিক ব্যবসার মতো আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ব্রাইড প্রাইস’ বা কনেপণ। বরপক্ষকে কনের পরিবারকে যে অর্থ দিতে হয়, অনেক এলাকায় সেই অর্থের পরিমাণও বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়েই গড়ে উঠেছে ‘ফ্ল্যাশ ম্যারেজ’-এর বাজার। ম্যাচমেকিং এজেন্সিগুলো দ্রুত পরিচয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। একটি বিজ্ঞাপনের ভাষায়, ‘সঠিক পরিচয়ের সঙ্গে তিন দিন, তিন বছরের প্রেমের সম্পর্কের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে।’
কিন্তু এই দ্রুততার আড়ালে প্রতারণার অভিযোগও বাড়ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ম্যাচমেকিং শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ অবৈধ কর্মকাণ্ড ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ম্যাচমেকিং শিল্প-সংশ্লিষ্ট অপরাধে ১ হাজার ৫৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করেছে প্রসিকিউটররা। বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ার পর পাঁচটি পৃথক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দেশব্যাপী অভিযানও শুরু করেছে।
একটি ঘটনায় একটি ম্যাচমেকিং এজেন্সি কারাওকে প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে ১২৮ জনকে প্রতারণা করেছে বলে জানা যায়। ওই ঘটনায় ২৫ লাখ ইউয়ানের বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ওয়াংয়ের নিজের ক্ষেত্রেও পরিচয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। কয়েক দিনের মধ্যে তিনি সাতজন নারীর সঙ্গে আলাদা ‘ব্লাইন্ড ডেট’ কক্ষে দেখা করেন। অষ্টম নারীকে তার পছন্দ হয়। কিন্তু প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল মাত্র আট থেকে দশ মিনিটের। এমনকি তাদের ফোন নম্বর বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য বিনিময় করতেও নিষেধ করা হয়েছিল। করলে জরিমানার ভয় দেখানো হতো।
মাত্র দুই-তিন দিনের মধ্যেই ওয়াং সিদ্ধান্ত নেন, এই নারীই তার জীবনসঙ্গী হতে পারেন। এরপর তিনি তিন লাখ ইউয়ানের বেশি কনেপণ দেন। বিয়ের অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ ইউয়ান। ম্যাচমেকিং এজেন্সি বিয়ের পুরো আয়োজনের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো নিজেদের প্রচারণাতেও ব্যবহার করে।
বিয়ের কয়েক মাস পর যখন স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন ওয়াং এজেন্সির কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে প্রতিষ্ঠানটি গুটিয়ে গেছে। এখন তিনি গুইয়াংয়ে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে অন্য পুরুষদের এ ধরনের প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক করছেন।
শুধু ওয়াং নন, আরও অনেক পুরুষ একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। গুইয়াংয়ের একটি ভাড়া করা ফ্ল্যাটে এমন কয়েকজন পুরুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে, যারা কেউ প্রতারণাকারী এজেন্সির মালিকদের খুঁজছেন, আবার কেউ অল্প সময়ের মধ্যে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রীদের কাছ থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এমনই আরেক ভুক্তভোগী ৫৯ বছর বয়সী শু রুলিন। ছেলের জন্য স্ত্রী খুঁজতে তিনি প্রায় পাঁচ লাখ ইউয়ান খরচ করেছিলেন। তার ছেলে পাত্রীকে প্রথম দেখার মাত্র সাত দিন পর বিয়ে করেন। বিয়ের পর ওই নারী আইফোন, ব্যবসার জন্য প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান এবং বিয়ের পোশাক ও গয়নার জন্য আরও এক লাখ ২০ হাজার ইউয়ান চেয়েছিলেন বলে শু দাবি করেন। পরে দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ওই নারী তাদের ছেড়ে চলে যান।
ম্যাচমেকিং এজেন্সির এক ব্যবস্থাপক অবশ্য অভিযোগগুলো পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। তিনি স্বীকার করেন, তাদের ক্লায়েন্টদের ওপর কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হয় না। স্থানীয় ম্যাচমেকাররা নারীদের সম্পর্কে তথ্য দেন এবং তারা সাধারণত একই এলাকার বা গ্রামের হওয়ায় একে অন্যের পারিবারিক পরিচয় জানেন এমনটাই তার দাবি।
এজেন্সিটি সেবার মূল্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। তবে ব্যবস্থাপক বলেন, কোনো পক্ষের দেয়া তথ্য মিথ্যা প্রমাণিত হলে ক্লায়েন্ট অর্থ ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন। তার দাবি, তাদের ক্লায়েন্টদের দেয়া তথ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সত্য।
তবে ভুক্তভোগীদের জন্য এসব আশ্বাস খুব একটা সান্ত্বনা হয়ে উঠছে না। কারণ প্রতারণার শিকার হওয়ার পর অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন। অনেক এজেন্সি পর্যাপ্ত অর্থ হাতিয়ে নেয়ার পর অফিস বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে কোনো স্ত্রী সত্যিই শুরু থেকেই প্রতারণার উদ্দেশ্যে বিয়ে করেছিলেন কি না, সেটিও আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করা কঠিন।
আইনজীবী ফান বিংহের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের আইনে এ ধরনের বিয়ের প্রতারণাকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ নেই। তাই ফৌজদারি অভিযোগ আনতে হলে প্রমাণ করতে হয় যে বিয়ের শুরু থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তির উদ্দেশ্য ছিল অর্থ হাতিয়ে নেয়া। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ যদি দাবি করে যে তারা সত্যিই সংসার করতে চেয়েছিল, পরে মতবিরোধ বা অসামঞ্জস্যের কারণে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, তখন বিষয়টি আইনি দৃষ্টিতে জটিল হয়ে পড়ে।
ওয়াং কিছু অর্থ ফেরত পেলেও তার পুরো ক্ষতি পূরণ হয়নি। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা সম্ভবত তার বিশ্বাসে। যে মানুষটি একসময় স্ত্রী পাওয়ার আশায় গুইয়াংয়ে গিয়েছিলেন, এখন তিনি আবার বিয়ে করার কথাই ভাবতে চান না।
তিনি বলেন, এমন ঘটনার পর আমি আর জানি না, আমি কখনো বিয়ে করতে পারব কি না। আগে থেকেই কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়া আমার জন্য কঠিন ছিল। এখন এত টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন আর আমি বিয়ে করার কথা ভাবব না।
প্রায় দুই বছর ধরে আইনি কাগজপত্র হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন ওয়াং। কবে তার বিবাহবিচ্ছেদ হবে, কবে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন, তা তিনি জানেন না।
তিনি বলেন, আমি জানি না এর সমাধান কবে হবে, যাতে আবার স্বাভাবিক জীবন শুরু করতে পারি। মনে হচ্ছে এর কোনো শেষ নেই।