সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সোমবার
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানকে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে রাশিয়া, ফাঁস নথিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৩ এএম
ইরানকে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে রাশিয়া। ছবি: সংগৃহীত
expand

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফাঁস হওয়া নথির ভিত্তিতে করা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানকে অত্যাধুনিক সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো ও তেহরানের কথিত এই গোপন সহযোগিতার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল’ নামে একটি প্রকল্প। এটি সফল হলে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত ২ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রথম এ দাবি সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁস হওয়া রুশ যোগাযোগপত্র, ভ্রমণ রেকর্ড এবং সামরিক প্রযুক্তি-সংক্রান্ত পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে প্রকল্পটির তথ্য পাওয়া গেছে। পরে দ্য আইরিশ টাইমসসহ আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে চলা এই গোপন কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল ইরানকে এমন প্রযুক্তি সরবরাহ করা, যার মাধ্যমে দেশটি র‍্যামজেট ইঞ্জিনচালিত সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। র‍্যামজেট প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্রকে শব্দের কয়েক গুণ গতিতে দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম করে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্ত্র যুদ্ধজাহাজবিরোধী হামলা এবং স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ২০২৩ সালে শুরু হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাতের সময়ও তা চলমান ছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রকল্পটির সমন্বয় করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর সঙ্গে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার সংশ্লিষ্টতার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাঁস হওয়া ভ্রমণ নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রুশ অস্ত্র কর্মকর্তা এবং এনপিও মাশিনোস্ট্রোয়েনিয়ার কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলী একাধিকবার ইরান সফর করেন। পরে ওই বছরের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রুশ পক্ষের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয় বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের র‍্যামজেট প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এবং দেশটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়নসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। ২০২৫ সালের মধ্যে ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত তথ্য পাওয়ার পর রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা ওই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক অস্ত্র বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজের মতে, এটি ‘রাশিয়া থেকে ইরানের কাছে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর’। তিনি বলেন, তেহরান বহু বছর ধরে এ ধরনের প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করে আসছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ইরানের হাতে এলে পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরী ও বড় যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কথিত সহযোগিতাকে রাশিয়া-ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোন রাশিয়া ব্যবহার করেছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো ও তেহরানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে ‘সি-ফোর-থ্রি-জিরো-এল’ প্রকল্প নিয়ে এখনো বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। ফাঁস হওয়া নথিতে সহযোগিতার প্রমাণের দাবি থাকলেও ইরান এরই মধ্যে এই প্রযুক্তিতে তৈরি কোনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে কি না, তার নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ বাস্তবে শুরু হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।

রাশিয়া ও ইরান—কোনো দেশই এ অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি মন্তব্য করেনি। ফলে ফাঁস হওয়া নথি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে দাবিটি সত্য হলে মস্কো-তেহরানের সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নজির এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
X
City bank
City bank