

২০২৩ সালে ডেরিক জনসন মাউই দ্বীপে নিজের বাড়ির পাশে তাঁর মায়ের ছাই সমাধিস্থ করেছিলেন। হালেকালা আগ্নেয়গিরির ঢালে অবস্থিত সেই জায়গা থেকে তাঁর নাতি-নাতনিদের দেখা যায়—এটাই ছিল তাঁর মায়ের শেষ ইচ্ছা।
২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফোন এল এফবিআই থেকে। জনসন তখন অষ্টম শ্রেণির একটি জিম ক্লাস নিচ্ছিলেন।
“আপনি কি এলেন লোপেসের ছেলে?”—একজন নারী জানতে চান, জনসন পরে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন।
একটি ঘটনা ঘটেছে, একজন এফবিআই এজেন্ট এসে সব ব্যাখ্যা করবেন—এ কথা জানানো হয়। তারপর প্রশ্ন আসে: “আপনি কি ‘রিটার্ন টু নেচার’ নামের কোনো ফিউনারেল হোম ব্যবহার করেছিলেন?”
তিনি আরও বলেন, “আপনি গুগলে ওদের নাম সার্চ করুন।”
ওয়েট রুমের কোলাহলের মাঝেই জনসন ফোনে “Return to Nature” লিখে সার্চ করেন। মুহূর্তেই অসংখ্য সংবাদ ভেসে ওঠে—সবকিছু যেন ঝাপসা হয়ে আসে।
একটির উপর আরেকটি করে রাখা শত শত লাশ। পচে যাওয়া দেহের তরল কয়েক ইঞ্চি জমে আছে। পোকামাকড়ের ঝাঁক। তদন্তকারীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। গভর্নরের জরুরি অবস্থা ঘোষণা।
জনসনের বমি বমি ভাব শুরু হয়, বুক চেপে আসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে পড়েন। আরেকজন শিক্ষক তাঁর আর্তনাদ শুনে ছুটে আসেন।
পরের সপ্তাহে দুই এফবিআই এজেন্ট জনসনের সঙ্গে দেখা করেন এবং নিশ্চিত করেন—তাঁর মায়ের দেহও সেই ১৮৯টি দেহের একটি, যেগুলো ‘রিটার্ন টু নেচার’-এর মালিক জন ও ক্যারি হলফোর্ড ২০১৯ থেকে ৪ অক্টোবর ২০২৩ পর্যন্ত কলোরাডোর একটি ভবনে ফেলে রেখেছিলেন। সেদিনই দেহগুলো উদ্ধার হয়।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো ফিউনারেল হোমে এত বিপুল সংখ্যক পচে যাওয়া লাশ উদ্ধারের অন্যতম ঘটনা। এর পর কলোরাডো অঙ্গরাজ্য তাদের শিথিল ফিউনারেল হোম নীতিমালা সংস্কার করে। তদন্তে আরও উঠে আসে—হলফোর্ড দম্পতি শোকাহত পরিবারগুলোর হাতে ভুয়া ছাই তুলে দিয়েছিল এবং কোভিড মহামারির সময় প্রায় ৯ লাখ ডলার সরকারি সহায়তা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছিল।
অথচ তাদের বিল বকেয়া থাকলেও তারা কিনেছিল টিফানি গয়না, বিলাসবহুল গাড়ি এবং লেজার বডি স্কাল্পটিং সেবা। গ্রাহকদের কাছ থেকে দাহক্রিয়ার জন্য নেওয়া প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ডলার তারা পকেটস্থ করে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে ওকলাহোমায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রায় ২০০টি লাশের অবমাননার অভিযোগ আনা হয়।
শত শত পরিবার জানতে পারে—যে ছাই তারা ছড়িয়েছে বা যত্ন করে রেখেছে, তা আসলে তাদের প্রিয়জনদের নয়। তাদের মা, বাবা, দাদা-দাদি, সন্তান এমনকি শিশুদের দেহ কলোরাডোর একটি ঘরে বছরের পর বছর পচে পড়ে ছিল।
জন হলফোর্ডের সাজা ঘোষণা হবে শুক্রবার—সম্ভাব্য ৩০ থেকে ৫০ বছর কারাদণ্ড। ক্যারি হলফোর্ডের সাজা হবে এপ্রিল মাসে। ডিসেম্বরে আদালত তাদের দোষ স্বীকারোক্তি গ্রহণ করে। হলফোর্ডদের আইনজীবীরা এপি’র মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
৪৫ বছর বয়সী জনসন বলেন, এফবিআই ফোন করার পর থেকে তিনি প্যানিক অ্যাটাকে ভুগছেন। তিনি নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন—হলফোর্ডের সাজা ঘোষণার সময় আদালতে কথা বলবেন এবং সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করবেন।
“যখন বিচারক শোনাবেন তুমি কত বছর জেলে যাবে, আর তোমাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে,” তিনি বলেন, “তখন তুমি আমার কণ্ঠ শুনবে।”
জন ও ক্যারি হলফোর্ড স্বামী-স্ত্রী হিসেবে কলোরাডো স্প্রিংসে ‘রিটার্ন টু নেচার’ ফিউনারেল হোম চালাতেন। তারা ‘গ্রিন বুরিয়াল’—অর্থাৎ এমবালমিং ছাড়া দাফন এবং দাহক্রিয়ার বিজ্ঞাপন দিতেন।
ক্যারি শোকাহত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলতেন, তাদের শেষ যাত্রার সিদ্ধান্তে সহায়তা করতেন। জনকে খুব একটা দেখা যেত না।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে, মায়ের মৃত্যুর পরপরই জনসন ফিউনারেল হোমে ফোন করেন। ক্যারি হলফোর্ড তাঁকে আশ্বস্ত করেন—তিনি তাঁর মায়ের ভালো যত্ন নেবেন।
কয়েক দিন পর তিনি জনসনের হাতে একটি নীল বাক্স তুলে দেন, যার ভেতরে ছিল ধূসর গুঁড়ো ভর্তি জিপ-টাই লাগানো প্লাস্টিকের ব্যাগ। তিনি বলেন, সেটাই তাঁর মায়ের ছাই।
জনসন বলেন, তিনি ফোনে আমাকে মিথ্যা বলেছেন। ইমেইলে মিথ্যা বলেছেন। সামনে দাঁড়িয়েও মিথ্যা বলেছেন
পরদিন কলোরাডো স্প্রিংসের একটি হলিডে ইন হোটেলে এলেন মেরি শ্রাইভার-লোপেসের স্মরণসভায় সেই বাক্সটি ফুল আর ছবির মাঝে রাখা হয়। যাজক যখন বলেন, “ছাই থেকে ছাই, ধুলো থেকে ধুলো,” জনসন বাক্সটির ওপর গোলাপের পাপড়ি ছড়ান।
২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, নজরদারি ক্যামেরায় দেখা যায়—একজন ব্যক্তি, যাকে তদন্তকারীরা জন হলফোর্ড বলে মনে করেন, পেনরোজ শহরের একটি ভবনে ঢুকছেন। ভেতরের ফুটেজে দেখা যায়, ডায়াপার ও হাসপাতালের মোজা পরা একটি দেহ স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। লোকটি দেহটি উল্টে মেঝেতে ফেলে দেন।
এরপর তিনি “স্ট্রেচারে থাকা পচা তরল অন্য দেহগুলোর ওপর মুছে দেন,” বলা হয়েছে গ্রেপ্তারি নথিতে। পরে আরও দুটি দেহ ভবনের ভেতরে ঢোকানো হয়।
স্ত্রীকে পাঠানো এক মেসেজে হলফোর্ড লেখেন, “ট্রান্সফারের সময় আমার গায়ে লোকজনের রস লেগে গেছে।”
জনসন বড় হয়েছেন কলোরাডো স্প্রিংসের একটি সাশ্রয়ী আবাসন এলাকায়, যেখানে তাঁর মা সবাইকে চিনতেন।
তাঁর বাবা খুব একটা পাশে ছিলেন না। পাঁচ বছর বয়সে জনসন দেখেছেন, তাঁর বাবা তাঁর মাকে ঘুষি মেরে টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলেন, তারপর একটি গিটারে আছড়ে দেন—গিটারটি ভেঙে যায়।
তাঁর মা-ই তাঁকে শেভ করতে শিখিয়েছেন, ফুটবল ম্যাচে গ্যালারি থেকে চিৎকার করে উৎসাহ দিতেন।
পাড়ার বাচ্চারা তাঁকে “মা” বলে ডাকত। কেউ কেউ প্রয়োজনে তাঁর বাড়ির সোফায় ঘুমাত, গরম খাবার পেত। জেহোভাহস উইটনেসরা এলে তিনি কথা বলতেন—কারণ তিনি অভদ্র হতে চাইতেন না। সামাজিক কাজে জীবন কাটিয়ে তিনি বলতেন, “তোমার যদি সাহায্য করার ক্ষমতা আর কণ্ঠ থাকে, তাহলে সাহায্য করো।”
জনসন প্রায় প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে ৬৫ বছর বয়সে তিনি অন্ধ ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ফোনে তিনি ছেলেকে বলতেন—নাতি-নাতনিদের কেমন দেখতে, তা বর্ণনা করতে।
২০২৩ সালের সুপার বোল রবিবারে তাঁর হৃদযন্ত্র থেমে যায়।
হাওয়াই থেকে উড়ে এসে জনসন তাঁর মায়ের উষ্ণ হাত ধরে রাখেন—হাত ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত।
২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর, ডিটেকটিভ সার্জেন্ট মাইকেল জোলিফ ও ডেপুটি করোনার লরা অ্যালেন পেনরোজ ভবনের বাইরে দাঁড়ান। দরজায় লেখা ছিল “Return to Nature Funeral Home” এবং একটি ফোন নম্বর। কল দিলে সেটি বিচ্ছিন্ন ছিল। চারপাশে ফাটা কংক্রিট আর হলুদ ঘাস। পেছনে একটি জীর্ণ হিয়ার্স, যার রেজিস্ট্রেশন মেয়াদোত্তীর্ণ। জানালায় একটি এসি চলছিল।
আগের দিন কেউ ভবন থেকে তীব্র দুর্গন্ধ আসার কথা জানিয়েছিল। একজন প্রতিবেশী ভেবেছিলেন এটা সেপটিক ট্যাংকের গন্ধ। আরেকজন বলেন, তাঁর মেয়ের কুকুরটি ছাড়া পেলেই ভবনের দিকে দৌড়াত।
গন্ধটা ছিল পচা সার বা পচা মাছের মতো—বাতাসে ভেসে এলেই সহ্য করা কঠিন।
দরজার নিচে ও দেয়ালে কালচে দাগ দেখে তারা ধারণা করেন, এটি পচে যাওয়া দেহের তরল।
জানালাগুলো ঢাকা থাকায় ভেতরে দেখা যাচ্ছিল না।
পরদিন পরিদর্শক আসেন, কিন্তু হলফোর্ড আসেননি। একটি জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ দেখতে পান—যেগুলো দেহের ব্যাগ বলে মনে হয়।
এরপর তল্লাশি পরোয়ানা জারি হয়।
৫ অক্টোবর, ২০২৩, সুরক্ষামূলক পোশাক পরে তদন্তকারীরা ২,৫০০ বর্গফুটের ভবনে ঢোকেন। ভেতরে তারা একটি বড় হাড় গুঁড়ো করার যন্ত্র এবং পাশে কুইকক্রিটের বস্তা পান—যা ছাই নকল করতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা।
বাথরুমসহ প্রায় এক ডজন ঘরে লাশ স্তূপ করে রাখা ছিল—কিছু দরজা পর্যন্ত আটকে গিয়েছিল।
মোট ১৮৯টি দেহ।
কিছু দেহ বছরের পর বছর ধরে পচছিল, কিছু কয়েক মাসের। অনেক দেহ ব্যাগে, কিছু চাদর ও ডাকটেপে মোড়া। কিছু খোলা অবস্থায়। পোকা-মাকড় ও ম্যাগটের ভিড় ছিল।
অনেক ব্যাগে তরল জমে ছিল, কিছু ছিঁড়ে গিয়েছিল। পাঁচ গ্যালনের বালতি দিয়ে তরল ধরা হচ্ছিল। অপসারণকারী দলকে মানুষের পচা তরলের স্তরের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট, হাসপাতালের ব্রেসলেট ও মেডিক্যাল ইমপ্ল্যান্ট দেখে দেহ শনাক্ত করা হয়। একটি দেহ পিকস পিক ন্যাশনাল সেমেটারিতে সমাহিত হওয়ার কথা ছিল।
সেই কবর খুঁড়ে দেখা যায়—ভেতরে একজন নারীর পচা দেহ, ডাকটেপ ও প্লাস্টিকে মোড়া। আর সেই ভিয়েতনাম ও পারস্য উপসাগর যুদ্ধের সেনার দেহ পাওয়া যায় পেনরোজ ভবনে—ম্যাগটে ঢাকা।
এফবিআইয়ের ফোনের পর জনসন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি আদালতে কথা বলবেন। কিন্তু কাছের মানুষদের সঙ্গেও তিনি কিছু বলতে পারছিলেন না।
মাসের পর মাস তিনি খবর পড়ে গেছেন, ফোনে ডুবে থেকেছেন—যতক্ষণ না সন্তানরা খেলতে ডাকত।
চোখ বন্ধ করলেই তিনি কল্পনা করতেন—ম্যাগট, মাছি, শতপদী, ইঁদুরে ভরা ভবনের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। এক যাজককে জিজ্ঞেস করেছিলেন—মায়ের আত্মা কি সেখানে আটকে ছিল? যাজক তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তা নয়। “দ্য ওয়াকিং ডেড” সিরিজের একটি পর্ব চলার সময় তিনি ভেঙে পড়েন।
তিনি থেরাপি শুরু করেন এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত হিসেবে নির্ণয় পান। অন্যান্য ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে জুম মিটিংয়ে যোগ দেন।
মায়ের দেহ শনাক্ত হওয়ার পর, ২০২৪ সালের মার্চে তিনি কলোরাডো যান। একটি ক্রিমেটোরিয়ামে তাঁর মায়ের দেহ একটি বাদামি বাক্সে রাখা ছিল।
“আমি জানি তুমি আমাকে দোষ দাও না, তবু আমি বলতে চাই—আমি দুঃখিত,” তিনি বাক্সে হাত রেখে বলেন।
তারপর দেহটি দাহযন্ত্রে ঢোকানো হয়। বোতাম চাপেন জনসন নিজেই।
থেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি ভালো হচ্ছেন। ছাত্র আর সন্তানদের সঙ্গে বেশি যুক্ত হচ্ছেন। আদালতে কী বলবেন, তা থেরাপিতেই অনুশীলন করছেন।
চোখ বন্ধ করে তিনি কল্পনা করেন—বিচারক আর হলফোর্ডদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
“ন্যায়বিচার—এই পুরো ঘটনায় যেটার ঘাটতি ছিল,” তিনি বলেন। “হয়তো এই বিচার আমাকে মুক্ত করবে।”
“আবার ভয়ও আছে—হয়তো করবে না। সম্ভবত করবে না।”
সূত্র: এবিসি নিউজ
মন্তব্য করুন